রাশিয়ায় নেই ইতালি, তবুও ট্রপি যাবে ইতালিতে

আগামী ১৫ জুলাই মস্কোর লুঝনিকি স্টেডিয়ামে যখন ফুটবল বিশ্বকাপ মাথার ওপরে তুলে ধরে নাচানাচি হবে, তখন সেখানে থাকবেন না কোনও ইতালীয়। ইতালি যে এবার বিশ্বকাপের যোগ্যতা–অর্জনই করতে পারেনি। চারবারের বিশ্বজয়ী দল দীর্ঘ ৫৮ বছর পর খেলবে না কোনও বিশ্বকাপে। যদি ভেবে থাকেন এবারের বিশ্বকাপ ইতালি–মুক্ত, তা হলে একেবারে ভুল ভাবছেন। না খেললেও, এবারের বিশ্বকাপে কোথাও না কোথাও যোগাযোগ থাকছে ইতালির।

জিডিই বার্তোনি। মিলানের মধ্যে অবস্থিত শিল্পাঞ্চল পাদের্নো দুগনানোর একটা ছোট কোম্পানি। সবমিলিয়ে ১২ কর্ম।চারি সেখানে কাজ করে। কিন্তু প্রতি চার বছর অন্তর এখানেই নিয়ে আসা হয় বিশ্বকাপ। এই সময়টা সেখানে গেলেই দেখা যাবে, ধুলোয় ঠাসা একটা ঘরে হাতুড়ির খটাখট আওয়াজ। একমনে কাজ করে চলেছেন কয়েকজন কর্মচারী। চলছে বিশ্বকাপের রূপচর্চা। ‌‘‌আসল ট্রফিটা যখন এখানে ফেরত আসে, তখন একটা অদ্ভুত অনুভূতি হয়। রোজই আমরা রেপ্লিকা ট্রফিটা দেখি। কিন্তু আসল ট্রফি নিয়ে কাজ করার মজাই আলাদা’,‌ বলছিলেন বার্তোনির ডিরেক্টর ভ্যালেন্টিনো লোসা।

১৯৭০ সালে তৃতীয়বার বিশ্বকাপ জেতার পর ব্রাজিলের ঘরে পাকাপাকিভাবে চলে যায় জুলে রিমে ট্রফি। এরপরেই ফিফা ব্যস্ত হয়ে পড়ে নতুন ট্রফির ডিজাইন বানাতে। পরের বছরই নতুন ট্রফি বানানোর দায়িত্ব পায় জিডিই বার্তোনি। কীভাবে?‌ ব্যাখ্যা করলেন ভ্যালেন্টিনোই। ‘‌গোটা বিশ্বজুড়ে ৫৩টা কোম্পানির প্রস্তাব এসেছিল ফিফার কাছে। কিন্তু একমাত্র আমরাই মডেল তৈরি করে নিয়ে গিয়েছিলাম। যা হাতে ধরে রীতিমতো দেখা যাবে। হাতে আঁকা একটা ডিজাইনের জায়গায় সোজাসুজি একটা মডেল, ওই ব্যাপারটাই আমাদের অনেকটা এগিয়ে দিয়েছিল চুক্তি পেতে।’‌ ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ারের সই করা একটা ফটোর সামনে দাঁড়িয়ে বলছিলেন ভ্যালেন্টিনো। এই বেকেনবাওয়ারই ১৯৭৪ সালে প্রথম তাঁদের তৈরি করা ট্রফি তোলেন।

বর্তমানে যে ট্রফি বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়কদের তুলতে দেখা যায়, তা তৈরি করেছিলেন ইতালীয় ভাস্কর সিলভিও গাজ্জানিগা। সাহায্য করেছিলেন ভ্যালেন্টিনোর বাবা জর্জিও, যাঁর পরামর্শে বিশ্বকাপের মাথার ওপরে গ্লোবটা তৈরি করা হয়। ট্রফিটি ৩৮ সেন্টিমিটার লম্বা এবং ছ’‌কিলো ওজন, তৈরি নিখাদ সোনা এবং ম্যালাকাইট দিয়ে। ‘‌চার বছর ধরে গোটা বিশ্ব ঘোরে ট্রফিটা। অনেক জিনিসের সংস্পর্শে আসে। একটু–আধটু ক্ষতিও হয়। সেটাকে ঠিকঠাক করে পুনর্নির্মাণ করাই আমাদের কাজ।’‌ বলছিলেন পিয়েত্রো ব্রামবিলা। বার্তোনির ওয়ার্কশপে যে আটজনের ওপর দায়িত্ব রয়েছে এই ট্রফিটা ঠিক করার, পিয়েত্রো তার মধ্যে একজন। তিনি আরও বললেন, ‘‌যখনই ফাইনালে বিশ্বকাপটা তোলা হয়, আমার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ে। মনে পড়ে, এই ট্রফিটা তো আমার হাত দিয়েই তৈরি।’‌

আসলের মতো নকল বিশ্বকাপ তৈরির দায়িত্বও রয়েছে বার্তোনির হাতেই। বিশ্বকাপজয়ী দলগুলি এই রেপ্লিকা ট্রফিই রেখে দেয়। রেপ্লিকাটি তৈরি হয় পিতল দিয়ে, যা একই মাপে সাজিয়ে পালিশ করার পর ২৪ ক্যারাটের সোনা দিয়ে মোড়া হয়। শুধু বিশ্বকাপই নয়, ইউরোপ, আফ্রিকা, আরব দেশের অনেক ট্রফি বার্তোনির থেকেই তৈরি হয়। কিন্তু কর্মচারীরাই জানালেন, বিশ্বকাপ বাকি সবগুলির থেকে আলাদা।
নেইমার, লিওনেল মেসি, হুগো লোরিস, সের্জিও র‌্যামোস নাকি ম্যানুয়ের ন্যুয়ের— জিয়ানলুইগি বুফোঁ ছাড়া এঁদের মধ্যে যে কারওর হাতে ট্রফিটা উঠতে পারে। কিন্তু কয়েক মাস পরে সে আবার ফেরত আসবে ইতালিতেই। রূপচর্চা করতে!‌‌

Print Friendly, PDF & Email