Download WordPress Themes, Happy Birthday Wishes

হযরত খাজা শাহনুর দরবেশ মাওলা (র:)’র জীবনী


মাওলানা মুহাম্মদ মোজাম্মেল হোসেন আল কাদেরী

সমগ্র বিশ্ব জাহানের প্রতিপালক আল্লাহ পাকের দরবারে লাখো-কোটি শুকরিয়া জ্ঞাপন করছি। অজ¯্র দরুদ-সালাম হুজুর পাক সাহিবে লাওলাকের দরবারে হাদিয়া / তোহফা পেশ করছি। ‘আল্লাহ পাক এরশাদ করেন- আল্লাহ যাকে ইচ্ছে করেন তাঁকে হেকমত প্রদান করেন, আর যাকে হেকমত প্রদান করেন, তাকে অনেক কল্যান প্রদান করেন আর বোধশক্তি সম্পূর্ণ লোকেরাই শুধু তা আলোচনা করে ( তা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে)- সূরা বাকারা-২৬৯। কাজেই মহান সিদ্ধি পুরুষ খাজা শাহনুর দরবেশ মাওলা র: এর জীবনী আলোচনা করা অতীব জরুরি। (জন্ম: ১৯৪২ ইং, ইন্তেকাল: ২০১১ইং)
‘হযরত শাহনুর দরবেশ মাওলা (র:) চট্টগ্রামস্থ আনোয়ারা ওষখাইন গ্রামে তাপস মুকুট হযরত শাহ আলি রজা কানুশাহ (র:) এর বংশে ১৯৪২ ইং ১৬ ডিসেম্বর, ১৩৬১ হিজরী ০৯ জিলহজ্ব, ১৩৪৯ বঙ্গাব্দে ২৯ অগ্রহায়ণ রোজ বুধবার জন্মগ্রহণ করেন।
১। তাঁহার পিতা মাওলানা মুফতি আমিনুর রহমান (র:) উচ্চস্তরের মাশায়েখ ও আলেম ছিলেন। দরবেশ মাওলা (র:) মায়ের গর্ভের অলী ছিলেন। তাঁহার জন্মের পূর্বেই তাঁহার দাদা হযরত শেখ হাবিবুর রহমান (র:) চার তরিকার কর্মপদ্ধতির (বিষু) নিয়ম অজিফাসহ লিখিত ভাবে খেলাফত, খলিফা, জুব্বা ও কোরআন শরীফ দরবেশ মাওলা (র:) এর জন্য রেখে যান। তিনি পাঁচ বছর বয়সে আপন পিতা হতে কোরআন শিক্ষা শেষ করে জোয়ারা মাদ্রাসায় ভর্তি হন। ১৯৬২ ইং উলা (মাস্টার্স) সম্পন্ন করে। আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের লক্ষ্যে বনবাসী হন।
উল্লেখ্য যে, তিনি ১৫ বছর বয়স হতে দাদার মাজারে ধ্যান মগ্ন থাকতেন। ছাত্র ও সাধন জীবনে তাঁহার অজ¯্র কারামত প্রকাশ পায়। যাহা তাঁহার ছাত্রজীবনে ও সাধন জীবনের বন্ধু ও শিক্ষকগণ হতে প্রমাণ পাওয়া যায়। তিনি ১৪ ডিসেম্বর ১৯৩৪ ইং ২৭ অগ্রাহায়ন ১৩৭১ বঙ্গাব্দ ১০ শাবান, ১৩৮৪ হিজরীতে পোলার বাপের টেক খরল্যা মুড়ায় শুক্রবার পাহাড়ে গমন করেন।
২। তিনি উক্ত গুহার মধ্যে ১৯৬৪ ইং হতে ১৯৭১ ইং পর্যন্ত ধ্যানমগ্ন ছিলেন। তিনি ১৯৭১ ইং হতে ১৯৭২ ইং পর্যন্ত আলী শাহ দরগাহে ছিলেন। অত:পর ১৯৭৩ ইং হতে ১৯৭৫ ইং এ তিন বছর বিভিন্ন বনাঞ্চলে ভ্রমণে রেয়াজতরত ছিলেন।
৩। তিনি পাহাড়ের সাধন জীবন হতে ২রা নভেম্বর ১৯৭৫ ইং ১৬ কার্তিক ১৩৮২ বঙ্গাব্দ, ২৭ শাওয়াল ১৩৯৫ হিজরী রোজ রবিবার বোর ৪টায় নিজ পিতৃগৃহে ফিরে আসেন।
৪। এছাড়া তিনি ১৯৭৬ ইং হতে ১৯৮২ ইং পর্যন্ত বান্দরবন, কক্সবাজার, রামু, মহেশখালী, ঈদগাহ, চকরিয়া, আমিরাবাদ, রাউজান, রাঙ্গুনিয়া, চট্টগ্রাম শহর, ফেনী, কুমিল্লা, হবিগঞ্জ ও সিলেট বিভিন্ন অঞ্চলে দ্বীনি খেদমত ও তাসাউফ চর্চায় সময় অতিবাহিত করেন। তাঁহার দীর্ঘ সাধন জীবনে কাশফের মাধ্যমে বিভিন্ন আউলিয়া কেরামের মাজার পুন:সংস্কার, মসজিদ, মক্তব, প্রতিষ্ঠিত করেন। দরবেশ মাওলা (র:) কে অগণিতবার মক্কা শরীফ, মদিনা শরীফ, বোগদাদ শরীফ, কারবালা ও আজমীর শরীফে অনেকেই সরাসরি দেখেছেন। এমনকি তাঁহার ওফাতের পরেও বিভিন্ন জায়গায় দেখা যাচ্ছে।
১৯৮৩ ইং সালে মিরসরাই থানার অন্তর্গত আওলাদে রাসুল (দ:) সৈয়দ জাকের হোসেন মীর এর পূণ্যময়ী মহিয়সী কন্যা মীর ফামোতুল-জোহরা এর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তাঁহার ঘরে তাঁহার সকল সন্তান ভূমিষ্ঠ হন। যেহেতু মজ্জুব ছিলেন এবং সংসার ত্যাগি ছিলেন। তাই এই কঠিন কাজ তাঁর পিতা মাওলানা মুফতি আমিনুর রহমানের একান্ত প্রচেষ্ঠায় সম্ভব হয়। তৎকালীন সময়ের পাক ভারতের মাশায়েখ ওলামাগণ তাঁহার সাধনার উচ্চ স্তরের সম্মান করতেন ও সঙ্গ লাভে ধন্য হতেন। হযরত শেখ ফরিদ উদ্দিন গঞ্জেশখর, শরফুদ্দিন বু’আলী শাহ ক্বালান্দার (র:) এর মত বিশ্ববিখ্যাত দরবেশদের কাতারেই তাহাকে গন্য করা হয়।
তিনি পূর্ব নাসিরাবাদ পশ্চিম ষোলশহর তরিক্বার ও বিষু কর্ম পরিচালনার উদ্দেশ্য বিষু মঞ্জিল প্রতিষ্ঠা করেন। এছাড়া কক্সবাজার, চন্দনাইশ, ওষখাইন, মিরসরাই, মস্তান নগর, কুমিল্লা, পাহাড়পুর, হবিগঞ্জ, নোয়াপাড়া সহ বিভিন্ন জায়গায় কমপ্লেক্স প্রতিষ্ঠিত করেন। তিনি তাঁহার কেরামতের প্রচার ও আলোচনা করা পছন্দ করতেন না। কেননা এতে লোকসমাগম বৃদ্ধি পায়। আর সাধনের ধ্যানের বিঘœ ঘটে। বিবাহিত জীবনেও তিনি বেশির ভাগ সময় হুজরা শরীফে ধ্যানমগ্ন থাকতেন। এ মহান সুফি সাধক বাংলায় বিরল। যিনি দুনিয়াবি বিন্দু পরিমাণও পরওয়া করতেন না। তিনি বিভিন্ন গ্রন্থ ফতওয়া রচনা করেন। তন্মধ্যে হতে “মিনহাজুল মুরিদাইন” প্রকাশিত। অপ্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে “নাজমুস ছাক্বিব” (কিতাবুত-তাওয়ারিখ) হাদিসের আলোকে মুনাফিকের স্বরূপ উন্মোচন, ওয়াউর রাদীপ ও বিভিন্ন অজিফা ইত্যাদি। এই মহান অলি ইন্তেকালের চার দিন পূর্বে নিজ দাফনের স্থান নির্দিষ্ট করে কাফন সাথে থাকতেন। অবশেষে নিজ যোগ্য সন্তান মাওলানা সাহেবকে গদিনীশিন করে ২৮ আশ্বিন ১৪১৭ বঙ্গাব্দ ১৩ অক্টোবর ২০১১ ইং রোজ বুধবার দিবাগত রাত ৩:০০টার সময় ইন্তেকাল করেন- “ইন্নালিল্লাহি ওয়াইন্না ইলাহি রাজিউন”। পরেরদিন বৃহস্পতিবার বাদে আছর তাঁর জানাযা অনুষ্ঠিত হয়। আর তাঁহাকে মাগরিবের সময় দাফন করা হয়। বর্তমানে তাঁহার ইন্তেকালের পরে অনেক কেরামত প্রকাশ হচ্ছে। অনেকেই কঠিন বিপদে সাড়া পাচ্ছেন এবং স্বপ্নেও সাক্ষাৎ লাভে ধন্য হচ্ছেন (সুবহানাল্লাহ)।
তিনি তাহার প্রথম পুত্র গদিনশীন করে যান ও মৌলানা মীর মঈন উদ্দিন নূরী ছিদ্দিকী ১০ জানুয়ারী ১৯৮৭ ইং মার্তৃগর্ভে ১৪ মাস অতিবাহিত করার পর এই মহান আউলিয়ার পরিবারে বিষু মঞ্জিলে জন্ম গ্রহণ করেন। তিনি প্রাথমিক শিক্ষা অর্জন করে নিজ পিতার তত্ত্বাবধানে আহসানুল উলুম জামেয়া গাউছিয়া আলীয়া মাদ্রাসা হতে দাখিল, আলিম ও ফাজিলে উল্লেখযোগ্যভাবে উত্তীর্ণ হন এবং ২০১১ ইং সনে কুষ্টিয়া ইসলামি ইউনিভার্সিটি থেকে কামিল হাদিস বিভাগে কৃর্তিত্বের সহিত সনদ অর্জন করেন। তিনি সুলতানুল হিন্দ আতায়ে রাসুল (দ:) খাজা মঈনুদ্দিন (র:) এর ত্বরিকা ও ছিলছিলার রুহানী ব্যক্তিত্ব সৈয়দ খাজা আব্দুল মাবুদ চিশতি (র:) এর হাতে ২০০৫ ইং সনে ১৯ বছর বয়সে বায়াত গ্রহণ করেন এবং ২০০৭ ইং সনে চিশতিয়া ত্বরিকায় খেলাফত অর্জন করেন। পুনরায় ঐ বৎসর ইলমে মারফতের উচ্চ মকাম ও জ্ঞান হাসিলের উদ্দেশ্যে নিজ পিতার কাছে গাউছে অলি ওষখাইনীরির (র:) ছিলছিলা মোতাবেক বিষু ত্বরিকায় বায়েত গ্রহণ করেন এবং ২০১১ ইং শ্রাবণ সংক্রান্ত বিষুতে নিজ পিতা কর্তৃক লিখিত ভাবে খিলক্বা ও বিষু দরবারের গদিনীশিন হন। তিনি মাত্র ১২ বছর বয়স হতে শের ও গজল রচনা করেন এবং ইসলামি বিষয়ে গবেষণা ও জ্ঞান চর্চা শুরু করেন। ২০০৬ ইং সনে মাত্র ২০ বছর বয়সে “দরূদ ও কেয়াম” নামক রেসালা রচনা করে আলোড়ন সৃষ্টি করেন।
তিনি বাল্যকাল হতে বাতেল ফেরকা বিদ্রোহী ও নিজ দায়িত্বে আত্মনির্ভরশীল, এই পর্যন্ত তিনি অনেক গ্রন্থ রচনা করেছেন। তাঁহার প্রকাশিত ও অপ্রকাশিত গ্রন্থগুলো হল- ১। দরুদ ও কেয়াম, ২। শ্রেষ্ঠ খুশি, ৩। আফজালুজ জিকির, ৪। আসমায়ে মোবারক, ৫। ইযানুল আযানা বিল খুরুজ, ৬। তাকলিদে ইলা আইম্মাতুল আরবাহ্ আলা শরিয়াতুন নাবুবিয়্যাহ, ৭। আল ইস্তেফসার গবেষণালবদ্ধ বাংলা ও উর্দু ভাষায় বিষয় ভিত্তিক অনেক মূল্যবান তাকবির পেশ করেছেন। তন্মধ্যে কিছু সংকলন হল:- ১। নুরুন আলা নুর, ২। রদ্দে লা-মাজহাবি, ৩। রাফেউল ইযাদায়নি ফিদু-দু’আ, ৪। হককুছ ছেমা, ৫। তারেফুল বায়াত, ৬। সেজদাতুত তাহিয়্যা আলা নজরুশ শরীয়াহ। সন্দেহাতীত ভাবে তিনি নবী ও অলি আল্লাহর উজ্জল ওয়ারেছ এবং মুসলিম উম্মাহর জন্য পথ পদর্শক। গাউছে অলি ওষখাইনীরির ত্বরিকার ধারক ও বাহক। আল্লাহ তাঁহার এলম আমল ও হায়াতের মধ্যে রাসুলুল্লাহ (দ:) এর উছিলায় বরকত ও রহমত দান করুক। (আমিন)

Print Friendly, PDF & Email