অর্থ ও বাণিজ্যশীর্ষ নিউজ

রংপুরে হাঁড়িভাঙ্গা আমের ব্যাপক ফলনের প্রত্যাশা, শুরু হয়েছে সংগ্রহ

 

২০২৫ (বাসস): আঁশবিহীন, রসালো ও অত্যন্ত সুস্বাদু ‘হাঁড়িভাঙ্গা’ আমের সংগ্রহ শুরু হয়েছে। রংপুর কৃষি অঞ্চলে এবার এ আমের ভালো ফলন হয়েছে। কৃষকরা এবার প্রচুর হাঁড়িভাঙ্গা আমের উৎপাদনের আশা করছেন।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আমের মুকুল আসার সময় কিছুটা শিলাবৃষ্টি ও অতিবৃষ্টির কারণে সামান্য ক্ষতি হলেও এবারের মৌসুমে হাঁড়িভাঙ্গা আমের ব্যাপক ফলনের সম্ভাবনা রয়েছে।

আমের মুকুল আসার আগে-পরে বৃষ্টিপাত কম হলেও পরবর্তীতে হওয়া বৃষ্টিপাতের ফলে কোমল আমের মসৃণ বৃদ্ধি ঘটে, যার ফলে এবার তুলনামূলকভাবে বড় আকারের হাঁড়িভাঙ্গা আম ফলন হয়েছে।

হাঁড়িভাঙ্গা আমের আনুষ্ঠানিক সংগ্রহ প্রক্রিয়া এবার ২০ জুন থেকে শুরু হওয়ার কথা ছিল। তবে তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে কৃষক ও ব্যবসায়ীরা আগে থেকেই গাছ থেকে আম পাড়া শুরু করেছেন। এই প্রক্রিয়া জুলাই মাস পর্যন্ত চলবে।

গত মৌসুমে রংপুর কৃষি অঞ্চলের পাঁচটি জেলায় ২ হাজার ৫৫৬ হেক্টর জমিতে তৈরি বাগান থেকে কৃষকরা ৩৮ হাজার ৫০৮ টন হাঁড়িভাঙ্গা আম উৎপাদন করেন।

রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ মো. সিরাজুল ইসলাম বাসস’কে বলেছেন, এর মধ্যে তারা কেবল রংপুর জেলার এক হাজার ৯১০ হেক্টর জমিতে তৈরি বাগান থেকে ২৯ হাজার ৭৭২ টন হাঁড়িভাঙ্গা আম উৎপাদন করেছেন।

কৃষক ও ব্যবসায়ীরা এবার কেবল রংপুর জেলায় দুইশ’ কোটি টাকার হাঁড়িভাঙ্গা আমের ব্যবসা করার আশা করছেন।

রংপুর অঞ্চলে সব ধরনের আম চাষ করা হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে হাঁড়িভাঙ্গা আম এই অঞ্চলে বাণিজ্যিক খ্যাতি অর্জন করেছে এবং অনেক মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থা পরিবর্তন করেছে।

সিরাজুল ইসলাম বলেছেন, হাঁড়িভাঙ্গা আম ইতোমধ্যে রংপুরের ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে, যা দেশে-বিদেশে ব্যাপক চাহিদা তৈরি করেছে।

মিঠাপুকুর উপজেলা, রংপুরের অন্যান্য সাতটি উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম, রংপুর কৃষি অঞ্চলের আওতাধীন দিনাজপুরের পার্বতীপুর, নবাবগঞ্জ, ফুলবাড়ী, বিরামপুর এবং চিরিরবন্দর উপজেলার অনেক গ্রামে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে আম চাষ করা হচ্ছে।

বাজার সূত্রে জানা গেছে, হাঁড়িভাঙ্গা আমের দাম বর্তমানে প্রতি কেজি ৫০ থেকে ৭০ টাকার মধ্যে রয়েছে এবং জুলাইয়ের শেষ নাগাদ আম শেষ হওয়ার সাথে সাথে দাম প্রতিদিন বাড়বে।

খোড়াগাছ ইউনিয়নের টেকানি গ্রামের আম চাষি শাহজাহান মিয়া বলেছেন, তিনি ২০১২ সাল থেকে একটি বাগানে হাঁড়িভাঙ্গা আম চাষ করছেন এবং প্রতি বছরই ভালো মুনাফা অর্জন করছেন।
মিঠাপুকুর উপজেলার আখিরারহাট গ্রামের সফল কৃষক আব্দুস সালাম জানান, তিনি ১৯৯২ সাল থেকে হাঁড়িভাঙ্গা জাতের আম চাষ করে আসছেন, যা রংপুর অঞ্চলে এর চাষ সম্প্রসারণে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছে।

তিনি বলেছেন, আমার পদাঙ্ক অনুসরণ করে অনেকেই এখন অন্যান্য ফসলের তুলনায় বেশি লাভের আশায় উঁচু-নিচু পরিত্যক্ত জমিতে হাঁড়িভাঙ্গা আম চাষের দিকে ঝুঁকছেন।

হাঁড়িভাঙ্গা আম বাগানের কিছু এলাকা ঘুরে দেখা যায়, পাইকারি ব্যবসায়ীরা হাঁড়িভাঙ্গা আম সংগ্রহ করে প্লাস্টিকের ঝুড়িতে ভরে দেশের বিভিন্ন স্থানে বাজারজাত করছেন। আম বাগানের মালিক, আম বিক্রেতা, বাগান রক্ষণাবেক্ষণের সাথে জড়িত ব্যক্তিরা, মৌসুমি আম বিক্রেতা, অনলাইনে আম বিক্রেতা, পরিবহন ব্যবসায়ী এবং কুরিয়ার সার্ভিস ব্যবসায়ীরা তাদের নিজস্ব উপায়ে আম কেনা-বেচায় ব্যস্ত সময় পার করছেন।

রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার পোড়াগঞ্জ হাটে হাঁড়িভাঙ্গা আমের সবচেয়ে বড় বাজার বসে। শনিবার সকাল থেকেই অটোরিকশা, সাইকেল, ভ্যান এবং পিকআপ ভ্যানে প্লাস্টিকের ঝুড়িতে করে আম আসতে শুরু করে। ক্রেতাদের উপস্থিতিতে আম বিক্রি জমজমাট হয়ে ওঠে। পোড়াগঞ্জ হাটের পাশের একটি গুদাম থেকে ট্রাকে আম বোঝাই করতে দেখা যায়। বাজারে মানুষের সমাগম দেখে যে কেউ ভাবতে পারেন, এই এলাকাগুলো হাঁড়িভাঙ্গা আমের রাজ্য।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর রংপুর আঞ্চলিক কার্যালয়ের অতিরিক্ত পরিচালক কৃষিবিদ মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, কৃষকরা প্রতি বছর হাঁড়িভাঙ্গা আম চাষ সম্প্রসারণ করছেন এবং রংপুর ও এর পার্শ্ববর্তী এলাকায় টেকসই কৃষি-অর্থনীতি অর্জিত হচ্ছে।

শফিকুল ইসলাম বলেছেন, অনেক যুবক এখন হাঁড়িভাঙ্গা আমের অনলাইন বিপণনের মাধ্যমে ভালো ব্যবসা করছেন এবং আগের বছরের মতো এবারও রংপুর থেকে কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে সারা দেশের মানুষের কাছে সুস্বাদু এ ফল পৌঁছে দিচ্ছেন।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button