বিশ্বঅলি শাহানশাহ্: মানবপ্রেমের আলোকবর্তিকা মাইজভাণ্ডারীর উজ্জ্বল নক্ষত্র

অসীম বিকাশ বড়ুয়া
১৯২৮ থেকে ১৯৮৮ সাল—এই ছয় দশকের জীবনকাল ছিল কেবল একটি সময়ের হিসেব নয়; এটি ছিল আধ্যাত্মিক সাধনা, নিঃস্বার্থ মানবতা ও ঐশী প্রেমের এক প্রোজ্জ্বল উপাখ্যান। তিনি বিশ্বঅলি শাহানশাহ হযরত সৈয়দ জিয়াউল হক মাইজভাণ্ডারী (কঃ)—মাইজভাণ্ডারী ত্বরিকার অন্যতম শ্রেষ্ঠ দিকপাল, ভক্তদের কাছে যিনি পরম শ্রদ্ধার “মওলা হুজুর” নামে পরিচিত।
আধ্যাত্মিক উত্তরাধিকার ও কঠোর রিয়াজত
মাইজভাণ্ডারী ত্বরিকার প্রবর্তক গাউসুল আযম হযরত সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভাণ্ডারী (কঃ)-এর প্র-প্রপৌত্র হিসেবে তিনি আধ্যাত্মিকতার এক পবিত্র উত্তরাধিকার বহন করেছেন। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা চলাকালীন এক অলৌকিক ঘটনার পর তিনি পার্থিব জীবনের সমস্ত আরাম-আয়েশ ত্যাগ করেন। শুরু হয় তাঁর কঠোর রিয়াজত (সাধনা)। দিনের পর দিন অনাহারে-অনিদ্রায় থাকা, ঠাণ্ডা জলে নিমজ্জিত থেকে বা নিভৃতে জিকিরে মগ্ন থাকার মতো কঠোর তপস্যা তাঁকে এক অনন্য আধ্যাত্মিক স্তরে উন্নীত করে। জীবনীকারেরা তাঁকে মজ্জুবে ছালেক দরবেশ (Majzoob-e-Salek Darvesh) হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন—এমন এক বিরল অবস্থা, যেখানে সাধক আধ্যাত্মিক আকর্ষণে পার্থিব চেতনা থেকে বিচ্ছিন্ন হলেও মানবকল্যাণে সর্বদা সক্রিয় থাকেন। তাঁর এই আধ্যাত্মিক শক্তি ও অলৌকিক ঘটনা (কারামত) তাঁকে বিশ্ব অলী (Universal Sufi Saint) উপাধিতে ভূষিত করে।
দর্শন: সর্বজনীন মানবতা ও সমাজকল্যাণ
শাহানশাহ্ (কঃ)-এর দর্শন ছিল সর্বজনীন মানবতা ও সামাজিক কল্যাণে নিবেদিত। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষের প্রতি তাঁর সমান ভালোবাসা ছিল। তাঁর বাণীগুলি আজও সেই আদর্শের প্রতিচ্ছবি:
“দুস্থ মানুষের উপকারের জন্য যদি হজ্বের উদ্দেশ্যে রাখা অর্থ ব্যয় করো, তবে তোমরা হজ্জে আকবরের (মহাহজ্ব) সওয়াব লাভ করবে।”
তাঁর এই উক্তিই প্রমাণ করে, তাঁর কাছে আধ্যাত্মিকতার অর্থ ছিল মানুষের পাশে দাঁড়ানো, আর্তের সেবা করা।
শাহানশাহ্ ট্রাস্ট: সেবার মহাযজ্ঞ
তাঁর মানবতাবাদী শিক্ষাকে বাস্তবে রূপ দিতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে শাহানশাহ্ হযরত সৈয়দ জিয়াউল হক মাইজভাণ্ডারী (কঃ) ট্রাস্ট। এই ট্রাস্ট নীরব সেবার এক মহাযজ্ঞ চালিয়ে যাচ্ছে:
শিক্ষায় আলোকবর্তিকা: ট্রাস্টের নিয়ন্ত্রণাধীন ২৩টি স্কুল ও মাদরাসায় ২৯৪২ জন ছাত্র-ছাত্রী পড়াশোনা করছে। এছাড়া, শিক্ষামূলক কার্যক্রমে এ পর্যন্ত ২১ লক্ষ টাকা বৃত্তি হিসেবে ৭৩৫ জন দরিদ্র ও মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীকে প্রদান করা হয়েছে। ২৫০ জন শিক্ষককে দেওয়া হয়েছে সৃজনশীল পদ্ধতি বিষয়ে প্রশিক্ষণ।
স্বাস্থ্যসেবা: মাইজভাণ্ডার দরবার শরীফ হোসাইনী দাতব্য চিকিৎসালয় থেকে বিনামূল্যে চক্ষু অপারেশনসহ ৩২ হাজার রোগীকে চিকিৎসা সেবা দেওয়া হয়েছে।
দারিদ্র্য বিমোচন: যাকাত তহবিল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন প্রকল্পে ১৫৬৪ জনকে ৩,৮৭,৪৪,৯৩০/- টাকা বিতরণ করা হয়েছে। সেলাই প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের মাধ্যমে নারী উন্নয়ন কর্মসূচীও চলছে নিরলসভাবে।
গবেষণা ও প্রকাশনা: তাসাউফ বিষয়ে বহুমুখী গবেষণা ও বিশ্লেষণমূলক জার্নাল ‘মাসিক আলোকধারা’ নিয়মিত প্রকাশিত হয় এবং ‘আলোকধারা বুকস’ থেকে ২০টি বই প্রকাশ করা হয়েছে।
ওরস ও খোশরোজ: মিলনমেলা
প্রতি বছর ২৬শে আশ্বিন মাইজভাণ্ডার শরীফের গাউসিয়া হক মঞ্জিলে তাঁর বার্ষিক ওরস শরীফ এবং ১০ই পৌষ পবিত্র খোশরোজ শরীফ মহাসমারোহে উদযাপিত হয়। কবি নজরুলের সেই বিখ্যাত পঙ্ক্তি—”আমি চিরতরে দূরে চলে যাব, তবু আমারে দেব না ভুলিতে”—যেন তাঁর ক্ষেত্রেই সত্য। এই মিলনমেলা কেবল একটি ধর্মীয় সমাবেশ নয়, বরং তাঁর শিক্ষা, মানবপ্রেমের বার্তা ও আধ্যাত্মিক ফয়েজ গ্রহণের এক বৃহৎ ক্ষেত্র।
শাহানশাহ হযরত সৈয়দ জিয়াউল হক মাইজভাণ্ডারী (কঃ) কেবল মাইজভাণ্ডারী ত্বরিকার অনুসারীদের কাছেই নন, বরং বিশ্বব্যাপী আধ্যাত্মিক মানুষের হৃদয়ে মানবতা ও সেবার এক অনুপম জীবন ও শিক্ষার মূর্ত প্রতীক হিসেবে চির জাগরূক হয়ে আছেন। তাঁর জীবন আমাদের শেখায়, নিঃস্বার্থ সেবা ও ঐশী প্রেমই পারে মানুষকে প্রকৃত মুক্তির পথে চালিত করতে।
লেখক: সাংবাদিক,ভাইস-চেয়ারম্যান(কোরিয়া বাংলা-প্রেসক্লাব)




