চট্টগ্রামশীর্ষ নিউজ

কর্ণফুলীতে চেকের মামলায় ৬ মাসের সাজাপ্রাপ্ত এনসিপি সংগঠক গ্রেপ্তার

বিশেষ প্রতিনিধি

চট্টগ্রামের কর্ণফুলীতে চেক প্রতারণার মামলায় সাজাপ্রাপ্ত এবং হত‍্যাসহ বেশ কয়েকটি মামলার এজাহারভূক্ত আসামি ইমরান হোসেন বাবলু (২৯) কে গ্রেপ্তার করেছে কর্ণফুলী থানা পুলিশ। গতরাত সাড়ে ১১টার দিকে নগরীর ২ নম্বর গেইটের একটি রেস্টুরেন্ট থেকে কর্ণফুলী থানার একটি সিভিল টিম তাকে গ্রেপ্তার করেন। কর্ণফুলী থানার ওসি মুহাম্মদ শরীফ গ্রেপ্তারের তথ্যটি নিশ্চিত করেছেন।

ওসি জানান, দুইদিন আগেও তার বিরুদ্ধে রুজুকৃত একটি মামলার বাদীকে হত‍্যার হুমকি দেওয়ায় কর্ণফুলী থানায় জিডি রেকর্ড করা হয়েছে। গ্রেপ্তারকৃত ইমরান হোসেন বাবলু চরলক্ষ্যা ইউপির ৬ নম্বর ওয়ার্ড গোয়ালপাড়া এলাকার আবদুল মোনাফ বাড়ির রেজাউল করিমের ছেলে। সে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলার এনসিপি সংগঠক বলে পরিচয় দিতেন। এনসিপির একাধিক কেন্দ্রীয় নেতাদের সাথে ছবিও রয়েছে তার।

ওসি শরীফ জানায়, একটি চেক প্রতারণা মামলায় সে ৬ মাসের সাজাপ্রাপ্ত আসামি। তার বিরুদ্ধে হত‍্যাসহ আরো বেশ কয়েকটি মামলা ও জিডি রেকর্ড রয়েছে থানায়। হত‍্যা মামলায় সে চার্জশিটভুক্ত প্রধান আসামি বলেও পুলিশ জানিয়েছে। গত রাতে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে নগরীর দু্লাই নম্বর গেইট এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

এর আগেও গত বছরের ২২ অক্টোবর বাবলুর একটি প্রাইভেট কার গাড়ি ভাঙচুর করার অভিযোগে থানায় মামলা করতে এসে উল্টো নিজেই আটক হয়েছেন কর্ণফুলী থানায়। সে একই এলাকার জাফর আহমদ (৫২) হত্যা মামলার প্রধান আসামি। তবে ওই মামলায় সে জামিন থাকলেও তখন আরেক সিআর মামলায় সাজাপ্রাপ্ত আসামি বলে জানা যায়। এ ঘটনায় আটক অপর দুই যুবক মো. দেলোওয়ার ও ইকবালও আটক হয়েছিলেন।

তখন ঘটনা সূত্রে জানা যায়, গত বছরের ২২ অক্টোবর রাত সাড়ে ৭ টার দিকে কর্ণফুলী উপজেলার চরলক্ষ্যা ইউনিয়নের আলী হোসেন এলাকায় একটি প্রাইভেটকার ও মোটরসাইকেলের সংঘর্ষ হয়। এতে প্রাইভেটকারের সামনের গ্লাস ভেঙে যায় ও মোটর সাইকেলেরও কিছুটা ক্ষতি হয়। প্রাইভেট কারের চালক ছিলেন ইমরান হোসেন বাবলু। এ ঘটনায় সে থানায় মামলা করতে আসে। মোটরসাইকেল আরোহী দুইজনও থানায় আসেন।

পরে পুলিশ বিশ্বস্ত সূত্র ও তথ্য উপাত্ত যাচাই-বাছাই করতে গিয়ে জানতে পারেন মামলা করতে আসা প্রাইভেটকার চালক যুবক (ভিকটিম) বাবলু কর্ণফুলীর জাফর হত্যা মামলা ও চেক প্রতারণা মামলার আসামি। পুলিশের খোঁজে তাঁর সত্যতাও মিলে। এতে বেরিয়ে আসে ইমরান হোসেন বাবলু সিআর সাজাপ্রাপ্ত আসামি। পরে অধিকতর তদন্তের প্রয়োজনে তিনজনকে থানায় আটক রাখা হয়।

এই প্রাইভেটকার ভাঙচুর ও হামলার ঘটনায় একাধিক মামলা এবং পুলিশের চার্জশিট নিয়ে বিতর্ক ছিল। পূর্ব শত্রুতার কারণে দায়ের করা মামলায় সাধারণ মানুষ ও নিরপরাধ ব্যক্তিদের ফাঁসানোর অভিযোগ উঠেছে। পরে ৩২ দিনের মধ্যে মামলার চার্জশিটে কর্ণফুলী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ফারুক চৌধুরী এবং যুবলীগ নেতা তারেক হাসান জুয়েলসহ বেশ কয়েকজন রাজনৈতিক নেতার নাম অন্তর্ভুক্তও হয়েছে।

মামলা করার পরে সমালোচনা ও তোপের মুখে এ মামলার বাদি বাবলুর পিতা রেজাউল করিম গত ৩ নভেম্বর চট্টগ্রামের চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে আবেদন করেন ১১ জন নিরাপরাধ আসামিকে বাদ দিতে। বাদি আদালতে লিখিত আবেদনে জানান, ১১ জন ব্যক্তি আসামি নয় এবং পুলিশ তাদের ভুলভাবে আসামি করেছে। তিনি এই ব্যক্তিদের এজাহার থেকে বাদ দেওয়ার জন্য আদালতের নির্দেশ চেয়েছেন। যদিও আদালত এ আবেদনের ওপর কোনো মন্তব্য না করে তা নথিভুক্ত করেন।

একই ঘটনার জের ধরে বাদি রেজাউল করিম আদালতে দ্রুত বিচার আইনে আরেকটি মামলা দায়ের করেন, যার মামলা নং-০৪। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা কর্ণফুলী থানার এসআই মো. বেলায়েত হোসেন তাড়াহুড়ো করে ৩০৭ ধারায় ও জসিম উদ্দিন (৫০) নামে এক আসামিকে বাদ দিয়ে ২৬ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট (অভিযোগপত্র নং-৪০৭) আদালতে দাখিল করেন। বাদির আদালতে দেওয়া আবেদনের পরেও ১১ নির্দোষ ব্যক্তিকে চার্জশিটে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

তদন্ত কর্মকর্তা মো. বেলায়েত হোসেন আদালতের কাছে বেঞ্চ সহকারির মাধ্যমে একটি অবহিতকরণ প্রতিবেদন দেন। প্রতিবেদনে তিনি উল্লেখ্য করেন, ‘একই ঘটনা নিয়ে একাধিক মামলা দায়ের করা আইনানুগভাবে সমিচীন নয়। সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩৫(২) অনুসারে কোনো অপরাধের জন্য কোনো ব্যক্তিকে একাধিকবার ফৌজদারিতে সোপর্দ ও দণ্ডিত করা যাবে না।’ অথচ এসব মামলায় আইন লঙ্ঘন করে বিষয়টি এড়িয়ে গেছেন বাদিরা।

অন্যদিকে একই ঘটনার রেশ ধরে ৭ বছর আগের একটি হত্যা মামলার সাক্ষীদের প্রাইভেটকার চাপা দিয়ে হত্যাচেষ্টার অভিযোগে গত বছরের ৪ নভেম্বর বিকালে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ৬ষ্ঠ আদালতে কাজী শরিফুল ইসলামের আদালতে মামলা টুকে দেন দেলোয়ার হোসেন সাঈদী (৩১) নামের আরেক যুবক।

আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে অভিযোগটি সরাসরি এজাহার হিসেবে গণ্য করতে সিএমপি কর্ণফুলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি)আদেশ দেন। যার সিআর মামলা নং-১৬। মামলার বাদি সাঈদী উপজেলার চরলক্ষ্যা (৬ নম্বর ওয়ার্ড) লাইল্যার বাপের বাড়ির মৃত নুরুল ইসলামের ছেলে। একাধিক মামলায় পক্ষ-বিপক্ষের পাশাপাশি রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের আসামি করা নিয়ে স্থানীয়রা লোকজন জানান, জমি বিরোধ নিষ্পত্তি কাগজপত্র দেখে হওয়া উচিত, তবে মামলার মধ্যে রাজনৈতিক প্রভাব স্পষ্ট হচ্ছে।

কর্ণফুলী থানার বর্তমান ওসি মুহাম্মদ শরীফ জানান, ‘মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মামলাটি তদন্ত করেছেন। আমি যোগদান করার পরে শুধু চার্জশিটটি অগ্রবর্তী করেছি, সেটা সঠিক। এর বাইরে আমি কিছু জানি না।’

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button