মার্চ, ২০২৬ (বাসস) : ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির ছেলে মোজতবা খামেনি ইসলামি প্রজাতন্ত্রটির নতুন প্রধান হিসেবে নিযুক্ত হয়েছেন। স্বল্পভাষী ও প্রচারবিমুখ হিসেবে পরিচিত ৫৬ বছর বয়সী মোজতবা তার বাবার কট্টরপন্থী নীতি ও আদর্শের উত্তরাধিকারী হিসেবেই পরিচিত।
প্যারিস থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি জানায়, বাবার শাসনামলে মোজতবা কোনো দাপ্তরিক পদে ছিলেন না। তবে ইরানের ক্ষমতার কেন্দ্রে থেকে তিনি নেপথ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতেন বলে ধারণা করা হয়। তিনি রক্ষণশীলদের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠত। বিশেষ করে ক্ষমতাধর ইসলামি রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)-র সঙ্গে তার গভীর সম্পর্ক রয়েছে। সংস্থাটি ইতোমধ্যে নতুন নেতার প্রতি তাদের আনুগত্য ঘোষণা করেছে।
সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে মোজতবা খামেনি নিযুক্ত হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, সশস্ত্র বাহিনী এবং বিচার বিভাগের সমর্থন লাভ করেন।
সরকারি অনুষ্ঠান বা গণমাধ্যমে খুব একটা দেখা না যাওয়ায় মোজতবার প্রকৃত প্রভাব নিয়ে সাধারণ মানুষ ও কূটনৈতিক মহলে দীর্ঘকাল ধরে নানা জল্পনা-কল্পনা ছিল। সোমবার মধ্যরাতের কিছু পরে ইরানের শীর্ষ ধর্মীয় সংস্থা ‘অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস’ এক বিবৃতিতে তাকে নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে ঘোষণা করে।
১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের মাধ্যমে ইরানে রাজবংশীয় শাসনের অবসান ঘটলেও, শেষ পর্যন্ত বংশপরম্পরায় নেতৃত্বের পরিবর্তনকেই বেছে নিল এই অ্যাসেম্বলি। যদিও আলী খামেনি ২০২৪ সালে নীতিগতভাবে এমন উত্তরাধিকার ব্যবস্থার বিরোধিতা করেছিলেন।
মোজতবা খামেনি ১৯৬৯ সালের ৮ সেপ্টেম্বর ইরানের পবিত্র শহর মাশহাদে জন্মগ্রহণ করেন। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি তেহরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলি বিমান হামলায় ৮৬ বছর বয়সে আলী খামেনি নিহত হন। এই হামলার মধ্য দিয়েই মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের সূত্রপাত হয়।
কাঁচা-পাকা দাড়ি ও কালো পাগড়ি পরিহিত মোজতবা খামেনি একজন ধর্মীয় পণ্ডিত। মহানবী (সা.)-এর বংশধর হিসেবে তিনি এই কালো পাগড়ি বা ‘সৈয়দ’ উপাধি ধারণ করেন। ১৯৮০’র দশকে ইরান-ইরাক যুদ্ধেও তিনি অংশ নিয়েছিলেন।
২০১৯ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্পের শাসনামলে যুক্তরাষ্ট্র তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। তখন মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় বলেছিল, কোনো সরকারি পদে না থাকলেও মোজতবা খামেনি তার বাবার হয়ে কাজ করেন এবং আঞ্চলিক কৌশল ও অভ্যন্তরীণ দমনমূলক নীতি বাস্তবায়নে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করছেন।
বিরোধীদের অভিযোগ, ২০০৯ সালে অতিরক্ষণশীল প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদের পুনর্নির্বাচনের পর যে বিশাল প্রতিবাদ আন্দোলন গড়ে উঠেছিল, সেটা দমনে মোজতাবা খামেনির ভূমিকা ছিল।
ব্লুমবার্গের এক অনুসন্ধানমূলক প্রতিবেদন অনুযায়ী, মোজতবা খামেনির প্রায় ১০ কোটি ডলারের বেশি সম্পদ রয়েছে। বিভিন্ন ভুঁইফোড় কোম্পানির মাধ্যমে তেল বিক্রির অর্থ তিনি ব্রিটেনের বিলাসবহুল আবাসন, ইউরোপের হোটেল এবং দুবাইয়ের স্থাবর সম্পত্তিতে বিনিয়োগ করেছেন বলে দাবি করা হয়েছে।
শিক্ষাজীবনে মোজতবা কোম শহরের ধর্মীয় সেমিনারি থেকে ধর্মতত্ত্ব নিয়ে পড়াশোনা করেছেন এবং সেখানে শিক্ষকতাও করেছেন। এতদিন তার ধর্মীয় পদবি ‘হুজ্জাতুল ইসলাম’ থাকলেও সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নিয়োগের পর তাকে ‘আয়াতুল্লাহ’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।
ইরানি কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, মোজতবা খামেনির স্ত্রী জোহরা হাদ্দাদ-আদেলও ওই যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলি বিমান হামলায় নিহত হয়েছেন।
এদিকে ইসরাইল ইরানের নতুন এই নেতৃত্বকে সতর্ক করে বলেছে, যেকোনো উত্তরসূরি এবং যারা তাকে নিয়োগ দিয়েছে, তাদের ওপর ইসরাইলের নজর থাকবে।
অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস-এর সদস্য সংখ্যা ৮৮ এবং তারা প্রতি আট বছর অন্তর নির্বাচিত হন। ১৯৮৯ সালে খোমেনির মৃত্যুর পর আলী খামেনিকে নির্বাচন এবং এবার মোজতবাকে দায়িত্ব প্রদানের মাধ্যমে সংস্থাটি এ পর্যন্ত দু’বার নেতৃত্ব পরিবর্তনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করল।




