রক্তদহ বিল পুনঃখননে বছরে ১৭০ কোটি টাকার অতিরিক্ত ফসল উৎপাদন সম্ভব

মার্চ, ২০২৬ (বাসস) : নওগাঁর ঐতিহাসিক রক্তদহ বিল পুনঃখনন করা হলে বছরে প্রায় ১৭০ কোটি টাকার অতিরিক্ত কৃষি উৎপাদন সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও স্থানীয় কৃষকরা।
নওগাঁর রানীনগর ও বগুড়ার আদমদীঘি উপজেলার মাঝামাঝি এলাকায় রক্তদহ বিলের অবস্থান। প্রায় ২২০ হেক্টর আয়তনের এ বিলটি ২২টি প্রবেশ খালের সঙ্গে যুক্ত। এসব খালের মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ১৮৫ কিলোমিটার। আর বিলের নিষ্কাশন খালের দৈর্ঘ্য প্রায় ২২ কিলোমিটার।
দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতার কারণে বর্তমানে আশপাশের প্রায় সড়ে ৪ হাজার হেক্টর জমিতে বছরে মাত্র একটি ফসল চাষ করা সম্ভব হচ্ছে। ফলে ২৩টি গ্রামের প্রায় ৭ হাজার কৃষক পরিবারের প্রায় ৩৫ হাজার মানুষ নিয়মিত আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ)-এর কর্মকর্তারা জানান, বিল ও সংযুক্ত খালগুলো পুনঃখনন করা হলে জলাবদ্ধতা দূর হবে। তখন কৃষকেরা বছরে আইআরআরআই-বোরো ও রোপা আমন—এই দুই ধরনের ধান চাষ করতে পারবেন। এতে বছরে প্রায় ১৭০ কোটি টাকার অতিরিক্ত কৃষি উৎপাদন করা সম্ভব হবে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ঐতিহাসিকভাবে রক্তদহ বিল এ অঞ্চলের মানুষের জীবিকার গুরুত্বপূর্ণ উৎস। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে খনন ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ফসল উৎপাদন কমে গেছে। একই সঙ্গে দেশীয় প্রজাতির মাছও এখন পাওয়া যাচ্ছে না।
সিম্বা গ্রামের কৃষক আলাউদ্দিন ফকির, মোস্তাক হোসেন ও জয়েদ ফকির এবং খাগড়া গ্রামের আবদুল হোসেন বাসসকে জানান, বিল এলাকায় তাদের জমি রয়েছে। কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতার কারণে তারা প্রতিবছরই ক্ষতির মুখে পড়ছেন।
তারা আরও জানান, বিল খনন করা হলে বছরে অন্তত দুটি ফসল চাষ করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি মাছের উৎপাদনও বাড়বে। এতে আশপাশের গ্রামের কৃষক ও জেলেদের জীবিকা উন্নত হবে।
নওগাঁয় বিএমডিএ’র নির্বাহী প্রকৌশলী রেজাউল ইসলাম বাসসকে জানান, রক্তদহ বিল ও এর আশপাশের খালগুলো পুনঃখনন হলে প্রতি হেক্টরে প্রায় ১২ মেট্রিক টন হিসেবে বছরে অতিরিক্ত প্রায় ৫৪ হাজার মেট্রিক টন ফসল উৎপাদন সম্ভব হবে। যার বাজারমূল্য প্রায় ১৭০ কোটি টাকা।
তিনি আরও জানান, খননকৃত মাটি ব্যবহার করে বিল ও খালের পাড় ঘেঁষে ১০ ফুট প্রশস্ত সড়ক নির্মাণ করা যেতে পারে। পাশাপাশি ভাঙন রোধে রিটেইনিং ওয়াল, কংক্রিট ব্লক ও প্যালিসেডিং নির্মাণ করা সম্ভব। এতে দুর্গম এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থাও উন্নত হবে।
এ ছাড়া গ্রামীণ সড়ক ও খালের পাড়ে ফলজ, বনজ ও ঔষধি গাছ লাগালে পাখির জন্য নিরাপদ আবাস তৈরি হবে এবং প্রাকৃতিক পরিবেশও উন্নত হবে।
রানীনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রাকিবুল হাসান বাসসকে জানান, উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে ইতোমধ্যে রক্তদহ বিল পর্যটন এলাকা ও বার্ড ভিলেজ গড়ে তোলা হয়েছে। বিলের নিষ্কাশন খাল রতনদাড়াতে মাছের অভয়ারণ্য তৈরি করা হয়েছে।
তিনি বলেন, জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় পর্যটন সুবিধা আরও উন্নত করতে বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এর বেশিরভাগ কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে।
কর্মকর্তারা জানান, বিলের সংরক্ষিত পানি সেচের কাজে ব্যবহার করা যাবে। এতে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমবে এবং পানির স্তর পুনরুদ্ধারেও সহায়তা করবে।
প্রাকৃতিক এ সম্পদের যথাযথ ও টেকসই ব্যবহার নিশ্চিত করতে রক্তদহ বিল পুনঃখননের প্রকল্প প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য ইতোমধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে।




