অর্থ ও বাণিজ্যশীর্ষ নিউজ

২০৩০ সাল নাগাদ দেশকে বৈশ্বিক প্রযুক্তি কেন্দ্র করতে ইলেকট্রনিকস শিল্পে দীর্ঘমেয়াদি প্রণোদনার পরিকল্পনা

 

১৬ জুন, ২০২৬ (বাসস) : সরকার ইলেকট্রনিকস ও ভোক্তা ইলেকট্রনিকস উৎপাদন খাতকে তৈরি পোশাক শিল্পের মতো দীর্ঘমেয়াদি প্রণোদনা ও নীতিগত সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। এর লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি বৈশ্বিক প্রযুক্তি কেন্দ্রে (গ্লোবাল টেক হাব) পরিণত করা।

অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বাজেট বক্তৃতায় বলেন, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) ও টেলিযোগাযোগ খাতের জন্য সরকারের কৌশলের চারটি মূল স্তম্ভের একটি হল ইলেকট্রনিকস ও ভোক্তা ইলেকট্রনিকস উৎপাদন। অন্য তিনটি স্তম্ভ হল-সংযোগ (কানেক্টিভিটি), ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচার (ডিপিআই) এবং ডেটা সেন্টার ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী ১০ বছর ইলেকট্রনিকস ও ভোক্তা ইলেকট্রনিকস উৎপাদন খাতকে তৈরি পোশাক শিল্পের জন্য বিদ্যমান ‘প্রতিটি সুবিধা’ দেওয়া হবে।

প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ, উৎপাদন ও রপ্তানির অনুকূল পরিবেশ তৈরি করাই এ নীতির লক্ষ্য।

এ উদ্যোগের যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করে অর্থমন্ত্রী বলেন, ১৯৭৮ সাল থেকে তৈরি পোশাক শিল্পের বিকাশে যেসব নীতি ও পদক্ষেপ কার্যকর ভূমিকা রেখেছে, সরকার সেগুলোই অনুসরণ করতে চায়। তার ভাষায়, কয়েক দশকে শিল্পটির বিকাশে সহায়ক যে মডেল, এ ক্ষেত্রেও একই পথ অনুসরণ করা হবে।

প্রস্তাবিত সহায়তা প্যাকেজের মধ্যে রয়েছে কাঁচামালে শূন্য শুল্ক, শূন্য মূল্য সংযোজনের সুযোগ এবং রপ্তানিতে আর্থিক প্রণোদনা। বাংলাদেশে প্রতিযোগিতামূলক ইলেকট্রনিকস শিল্প গড়ে তুলতে এসব পদক্ষেপকে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে দেখা হচ্ছে।

আগামীতে এ খাতে ধাপে ধাপে করের হার কমানো হবে উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘আগামী পাঁচ থেকে ১০ বছরে প্রতি দু’বছর অন্তর আমরা করহার কমাব।’

ইলেকট্রনিকস ও ভোক্তা ইলেকট্রনিকস উৎপাদন উদ্যোগটি দেশের ডিজিটাল অর্থনীতি ও প্রযুক্তি পরিবেশ শক্তিশালী করার বৃহত্তর রোডম্যাপের অংশ।

নীতিমালা প্রণয়নের সময় সরকার ফ্রিল্যান্সার ও কনটেন্ট নির্মাতাসহ বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা করেছে। দেশের ভবিষ্যৎ সাফল্য নিশ্চিত করতে কী কী পদক্ষেপ প্রয়োজন, তা নির্ধারণে এসব মতামত নেওয়া হয়। আলোচনায় পাওয়া পরামর্শ ও সুপারিশ যত্নসহকারে পর্যালোচনা করে বাজেটে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

কৌশলের ‘কানেক্টিভিটি’ স্তম্ভে সারা দেশে ৫জি সেবার ব্যাপক সম্প্রসারণ এবং আন্তর্জাতিক মানের ওয়াইফাই সুবিধা নিশ্চিত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচার (ডিপিআই) স্তম্ভের অধীনে প্রত্যেক নাগরিকের জন্য ডিজিটাল পরিচয়পত্র (ডিজিটাল আইডি) ও ডিজিটাল ওয়ালেট চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে দেশের ডিজিটাল ভিত্তি আরও শক্তিশালী হবে এবং ডিজিটাল সেবার পরিধি বাড়বে।

রোডম্যাপে ডেটা সেন্টার অবকাঠামো উন্নয়ন এবং স্টার্টআপ ও উদ্ভাবকদের জন্য এপিআই (অ্যাপ্লিকেশন প্রোগ্রামিং ইন্টারফেস) উন্মুক্ত করার বিষয়টিও অগ্রাধিকার পেয়েছে। এসব পদক্ষেপ উদ্ভাবন ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নের উপযোগী পরিবেশ তৈরি করবে।

দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী বলেন, আগামী তিন থেকে পাঁচ বছর ধারাবাহিক নীতি ও সঠিক নীতিগত কাঠামো বজায় রাখা গেলে ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ বৈশ্বিক প্রযুক্তি কেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশের সুযোগ পাবে।

তিনি বলেন, ইলেকট্রনিকস ও ভোক্তা ইলেকট্রনিকস উৎপাদনে প্রণোদনা, কানেক্টিভিটি, ডিজিটাল অবকাঠামো, ডেটা সেন্টার ও এআই খাতে বিনিয়োগকে এ লক্ষ্য অর্জনের মূল ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ বলেন, বস্টন কনসাল্টিং গ্রুপ (বিসিজি) ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের গবেষণা অনুযায়ী ২০২৯ সালের মধ্যে বাংলাদেশ বিশ্বের নবম বৃহত্তম ভোক্তা ও ডিজিটাল অর্থনীতিতে পরিণত হতে পারে।

তিনি বলেন, ‘আমাদের নিজেদের প্রস্তুত করতে হবে। নিজেদের উপযুক্ত করে গড়ে তুলতে হবে।’

রেহান আসিফ জানান, আগামী মাসে দেশের প্রথম ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচার (ডিপিআই) নির্মাণের কাজ শুরু হবে, যার ভিত্তি হবে ‘এক নাগরিক, এক ডিজিটাল আইডি, এক ডিজিটাল ওয়ালেট’।

এ উদ্যোগের আওতায় প্রতিটি নাগরিক একটি ডিজিটাল পরিচয়পত্র পাবে এবং ডিজিটাল ওয়ালেটের মাধ্যমে ডিজিটাল অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত হবে।

রেহান আসিফ বলেন, সরকার ডেটা সেন্টার অবকাঠামো গড়ে তোলা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বাড়ানো এবং উদ্ভাবক ও স্টার্টআপগুলোর জন্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম উন্মুক্ত করার পরিকল্পনাও নিয়েছে।

তিনি আরও বলেন, পৃথিবীর কোনো সরকার বা দেশ একা এটা করতে পারে না। সরকারের কাজ প্রয়োজনীয় ইকোসিস্টেম তৈরি করা। অন্যদিকে বেসরকারি খাত ও উদ্ভাবকেরা বিভিন্ন অ্যাপ্লিকেশন ও সেবা উদ্ভাবন করবে।

তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের এই উপদেষ্টা বলেন, সরকারের কৌশলের চতুর্থ স্তম্ভ হলো ইলেকট্রনিকস ও ভোক্তা ইলেকট্রনিকস শিল্পের বিকাশ।

তার মতে, বিনিয়োগ ও উৎপাদন বৃদ্ধিতে উৎসাহ দিতে আগামী ১০ বছর এ দুটি খাতকে একই ধরনের সুবিধা দেওয়া হবে।

নীতির ধারাবাহিকতা ও টেকসই সহায়তা অব্যাহত থাকলে ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ বৈশ্বিক পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হয়ে উঠতে পারবে বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

তিনি বলেন, দেশের ডিজিটাল রূপান্তর এগিয়ে নিতে সরকার টেলিকম অপারেটর, সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান, উদ্ভাবক, বিনিয়োগকারী ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ চালিয়ে যাবে।

টেলিযোগাযোগ উপদেষ্টা বলেন, ‘অংশীদার হিসেবে আমাদের সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।’ একই সঙ্গে তিনি অংশীজনদের আশ্বস্ত করেন যে, সরকার তাদের মতামতের প্রতি উন্মুক্ত থাকবে এবং খাতটির উন্নয়নে সহায়তা অব্যাহত রাখবে।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ইলেকট্রনিকস, ডিজিটাল ডিভাইস ও সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদন শিল্পকে উৎসাহিত করতে একাধিক আর্থিক প্রণোদনা রাখা হয়েছে।

মোবাইল ফোন, রেফ্রিজারেটর, এয়ার কন্ডিশনার, ওয়াশিং মেশিন, সিসিটিভি ক্যামেরা, কম্পিউটারসহ বিভিন্ন ডিজিটাল পণ্যের কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক অব্যাহতির সুবিধা ২০৩০ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।

সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের বিকাশে চিপ ডিজাইন, পরীক্ষা ও প্যাকেজিংয়ে ব্যবহৃত কাঁচামালের ওপর নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক, মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) ও অগ্রিম কর মওকুফ করা হয়েছে। ২০৩১ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত এসব পণ্যে কেবল এক শতাংশ আমদানি শুল্ক প্রযোজ্য হবে।

এ ছাড়া মোবাইল ফোন উৎপাদন ও সংযোজন, কম্পিউটার এবং প্রযুক্তিপণ্যের ওপর শর্তসাপেক্ষ ভ্যাট অব্যাহতি ২০৩০ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।

স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত রেফ্রিজারেটর, ফ্রিজার, এয়ার কন্ডিশনার ও কম্প্রেসরের ওপর ভ্যাট ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে সাড়ে ৭ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে, যা একই সময় পর্যন্ত কার্যকর থাকবে।

এ ছাড়া মোবাইল ফোন উৎপাদনে ব্যবহৃত ২২ ধরনের কাঁচামালের অগ্রিম আয়কর (এআইটি) হার কমিয়ে ১ শতাংশ করা হয়েছে। স্মার্ট কার্ড ও ব্যাংক কার্ড উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামালের ওপর অতিরিক্ত ৫ শতাংশ আমদানি শুল্কও প্রত্যাহার করা হয়েছে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button