বিশেষ খবরবিশ্ব

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ অবসানে চুক্তি স্বাক্ষর করলেন ট্রাম্প ও ইরানের প্রেসিডেন্ট

 

 

জুন, ২০২৬ (বাসস) : মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে বুধবার একটি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান।

চুক্তি অনুযায়ী, তেহরান সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত হ্রাস করবে এবং এর বিনিময়ে দেশটি ব্যাপক অর্থনৈতিক সুবিধা পাবে।

জি-৭ সম্মেলন শেষে ফ্রান্সের ভার্সাই প্রাসাদে মোমবাতির আলোয় আয়োজিত নৈশভোজে সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেন ট্রাম্প। প্রেসিডেন্টের এক সহকারীর প্রকাশ করা ভিডিওতে দেখা যায়, স্বাগতিক ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ ও উপস্থিত অতিথিরা এ সময় করতালি দেন।

ওয়াশিংটন থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর জানিয়েছে।

প্রাসাদ থেকে বেরিয়ে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, ‘এইমাত্র স্বাক্ষর করলাম।’

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাকাই রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ইরনাকে বলেন, ‘দুই দেশের প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষরের মাধ্যমে দলিলটি চূড়ান্ত হয়েছে।’

চুক্তিতে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালনকারী পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ জানান, চুক্তিটি ‘তাৎক্ষণিকভাবেই কার্যকর হবে।’

এই চুক্তির লক্ষ্য হলোÑ গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের শুরু করা যুদ্ধের অবসান ঘটানো।

ওই যুদ্ধের জবাবে ইরান অঞ্চলজুড়ে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়। এতে বিশ্ব অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। এর প্রতিক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোতে জাহাজ চলাচল অবরুদ্ধ করে রাখে।

শাহবাজ শরিফ লিখেছেন, ‘প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান অবিলম্বে হরমুজ প্রণালী খুলে দেবে এবং যুক্তরাষ্ট্রও সঙ্গে সঙ্গে নৌ অবরোধ প্রত্যাহার করবে।’

চুক্তি অনুযায়ী, ওয়াশিংটন ইরানের অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে আসা তেল-সংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞাও তাৎক্ষণিকভাবে প্রত্যাহার করবে।

এছাড়া ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে চূড়ান্ত সমঝোতা হলে, আঞ্চলিক দেশগুলোর সমর্থনে গঠিত ৩০০ বিলিয়ন ডলারের পুনর্গঠন তহবিল ছাড়ে সহায়তা করবে যুক্তরাষ্ট্র।

এর আগে, দলিলটিতে ইরানের প্রধান আলোচক ও পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ এবং মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের স্বাক্ষরের কথা ছিল।

তবে ইরান জানায়, সরাসরি উপস্থিত থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের আর প্রয়োজন নেই।

তবে শাহবাজ শরিফ জানান, শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে একটি আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠান হবে এবং সেখান থেকে কারিগরি পর্যায়ের আলোচনা শুরু হবে।

-‘বড় বিজয়’-

ইরান দাবি করেছে, এই চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের ‘ব্যর্থতার’ প্রতিফলন।

চুক্তির পাঠ উভয় পক্ষ প্রকাশ করার পর বুধবার রাতে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে গালিবাফ বলেন, ‘মানুষ এটি দেখবে এবং নিজেরাই বিচার করবে।’

চুক্তির বৈশ্বিক গুরুত্ব তুলে ধরে চীন জানায়, তাদের শীর্ষ কূটনীতিক তেহরানকে বলেছেন, সব পক্ষের জন্য নিজেদের অঙ্গীকার ‘সত্যিকার অর্থে বাস্তবায়ন’ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তবে যুদ্ধ বন্ধের ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত তার নিজ দেশের কিছু মিত্রের মধ্যেও অস্বস্তি সৃষ্টি করেছে। এই যুদ্ধে ১৩ জন মার্কিন সেনাসদস্য নিহত হন এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ ব্যবহার হয়।

চুক্তিটি মূলত একটি অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা। এর উদ্দেশ্য হলো ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির দীর্ঘমেয়াদি নিয়ন্ত্রণ নিয়ে জটিল আলোচনার জন্য সময় তৈরি করা। ওয়াশিংটনের দীর্ঘদিনের অভিযোগ, ইরান গোপনে পারমাণবিক বোমা তৈরির কর্মসূচি চালিয়ে আসছে।

ট্রাম্প বুধবারই বলেছিলেন, চুক্তি লঙ্ঘন করলে, তিনি ইরানের ওপর ‘ভয়াবহ বোমা হামলা’ চালাতে প্রস্তুত।
তবে তার নিজ দল রিপাবলিকান পার্টির সিনেটর বিল ক্যাসিডি এ চুক্তির তীব্র সমালোচনা করেন।

তিনি বলেন, ‘ইরানের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা থামানো যায়নি। তারা শিখে গেছে যে হরমুজ প্রণালী নিয়ে হুমকি কার্যকর কৌশল। নিষেধাজ্ঞা উঠে যাচ্ছে, বোমাবর্ষণ বন্ধ হয়েছে। কয়েক দশকের মধ্যে এটি সবচেয়ে বড় পররাষ্ট্রনীতি-সংক্রান্ত ভুল।’

ইরান-সমর্থিত লেবাননের শিয়া আন্দোলন হিজবুল্লাহর প্রধান নাঈম কাসেম বুধবার চুক্তিটিকে ইরানের জন্য ‘বড় বিজয়’ বলে অভিহিত করেন।

তিনি লেবাননকে যুদ্ধবিরতির আওতায় রাখার বিষয়ে তেহরানের অবস্থানের প্রশংসা করেন।

গত ২ মার্চ ইরানের সমর্থনে হিজবুল্লাহ ইসরাইলের দিকে রকেট নিক্ষেপ করলে লেবাননও এই সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে।

– শুরু হচ্ছে আলোচনা-

এখন দুই মাসের আলোচনার সময়কাল শুরু হচ্ছে। এর প্রথম ধাপ হিসেবে বহু প্রতীক্ষিত হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়া হবে।

মার্কিন কর্মকর্তাদের প্রকাশ করা চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, ইরান তাদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের হ্রাস হালকা করবে। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ)’র তত্ত্বাবধানে নিজ দেশেই এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে পারে।

এর ফলে ইরান আরও ব্যাপক অর্থনৈতিক সহায়তা পাবে।

তবে এক মার্কিন কর্মকর্তা জানান, এ সহায়তার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে কোনো আর্থিক অবদান রাখতে হবে না।

মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তিচুক্তির আশাবাদে সাম্প্রতিক দিনগুলোতে তেলের দাম কমছিল। তবে বুধবার সেই ধারা উল্টো দিকে মোড় নেয়।

চুক্তি স্বাক্ষর নিয়ে অনিশ্চয়তা ছড়িয়ে পড়ায় এক পর্যায়ে তেলের দাম প্রায় ৫ শতাংশ বেড়ে যায়। পরে দিনের শেষভাগে পরিস্থিতি স্থিতিশীল হয়।
-লেবানন সীমান্তে উত্তেজনা-

চুক্তি ঘোষণার পর লেবাননে সহিংসতা কমলেও দেশটির দক্ষিণাঞ্চলে ইসরাইলি হামলায় অন্তত পাঁচ জন নিহত হয়েছে বলে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে। একই সঙ্গে বুধবার দক্ষিণ লেবাননে ইসরাইলি অভিযানের খবরও প্রকাশ করা হয়।

ইসরাইলি সেনাবাহিনী জানায়, দক্ষিণ লেবাননে বিস্ফোরকবাহী একটি ড্রোনের আঘাতে বুধবার পাঁচ সেনা সদস্য আহত হয়েছেন। তাদের একজনের অবস্থা গুরুতর।

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তির পর এ ধরণের ঘটনা নিয়ে এটিই তাদের প্রথম ঘোষণা।

এছাড়া দক্ষিণ লেবাননে দায়িত্ব পালনরত সেনাদের লক্ষ্য করে ছোড়া ‘বেশ কয়েকটি রকেট’ তাদের বিমানবাহিনী ভূপাতিত করেছে বলেও জানায় ইসরাইলি সামরিক বাহিনী।

তবে এতে হতাহতের কোনো খবর পাওয়া যায়নি।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button