আঞ্চলিকশীর্ষ নিউজ

রাজু ভাস্কর্যের সামনে ফুলজোড়–করতোয়া নদী রক্ষায় বিক্ষোভ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি

উত্তরবঙ্গের ফুলজোড় ও করতোয়া নদীর দূষণের প্রতিবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের সামনে বিক্ষোভ করেছেন তরুণ জলবায়ু ও পরিবেশকর্মীরা। আজ অনুষ্ঠিত এই কর্মসূচির আয়োজন করেছে পরিবেশবাদী সংগঠন ইয়ুথনেট গ্লোবাল। কর্মসূচিতে সিরাজগঞ্জ থেকে আসা প্রায় অর্ধশত আদিবাসী নারী, পুরুষ ও শিশুরাও অংশ নেন।

সমাবেশে বক্তব্য দেন জাতীয় আদিবাসী পরিষদ বগুড়া জেলা কমিটির সভাপতি সন্তোষ সিং বাবু, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) কার্যনির্বাহী সদস্য সর্বমিত্র চাকমা, কবি সুফিয়া কামাল হলের সাধারণ সম্পাদক মোছা. রুকু খাতুন প্রমুখ। সমাবেশের সভাপতিত্ব করেন ইয়ুথনেট গ্লোবালের নির্বাহী সমন্বয়কারী সোহানুর রহমান। জলবায়ু কর্মী সিয়াম সিকদারের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত সমাবেশে আন্দোলনকারীরা শিল্পবর্জ্যের বিষয়ে জরুরি তদন্ত, পরিবেশ আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন, দূষণের জন্য দায়ী প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং নদী রক্ষায় কাজ করা পরিবেশকর্মীদের হয়রানি বন্ধের দাবি জানান।

প্রতিবাদে অংশ নেওয়া আদিবাসী প্রতিনিধিরা অভিযোগ করেন, শিল্পকারখানার দূষণে নদীর পানি ও আশপাশের পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এতে কৃষি, মৎস্যসম্পদ ও স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকা ঝুঁকির মুখে পড়েছে। ভূমি দখল ও শিল্প দূষণের কারণে বহু পরিবার ইতিমধ্যে সংকটে পড়েছে বলেও তারা জানান।

প্রায় ৫৫ কিলোমিটার দীর্ঘ ফুলজোড় নদীর দুই তীরে সিরাজগঞ্জ ও বগুড়া জেলার কয়েক লাখ মানুষ জীবিকা নির্বাহের জন্য নদীটির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু শিল্পবর্জ্যের কারণে নদীর পানি দূষিত হয়ে পড়ছে এবং জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়েছে। অভিযোগ রয়েছে, বগুড়া-৫ আসনের সংসদ সদস্য গোলাম মোহাম্মদ সিরাজের পরিবারের মালিকানাধীন এসআর কেমিক্যালস ও মজুমদার প্রোডাক্টসসহ কয়েকটি শিল্পকারখানার রাসায়নিক বর্জ্যের কারণে ফুলজোড় ও করতোয়া নদী মারাত্মক দূষণের শিকার হচ্ছে।

পরিবেশকর্মীরা বলেন, ফুলজোড় ও করতোয়া নদী রক্ষার আন্দোলন অব্যাহত থাকবে। নদী, পরিবেশ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থে এই আন্দোলনে তরুণদের অংশগ্রহণ আরও জোরদার হবে।

সমাবেশে অংশ নেয়া সিরাজগঞ্জের তরুণ পরিবেশকর্মী ফয়সাল বিশ্বাস বলেন, “নদী আমাদের জীবনপ্রবাহ। নদী দূষণ বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে আমরা শুধু পরিবেশগত বিপর্যয় নয়, আমাদের জীবিকাও হারাব। নদী নিরাপদ না হওয়া পর্যন্ত আমরা লড়াই চালিয়ে যাব।”

ইয়ুথনেট গ্লোবালের নির্বাহী সমন্বয়কারী সোহানুর রহমান বলেন, “নদী জীবন্ত সত্তা। কিন্তু শিল্পবর্জ্যের দূষণ আমাদের নদীগুলোকে ধ্বংস করছে এবং বাস্তুতন্ত্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। বাংলাদেশের নদীগুলো আমাদের জীবিকা ও পরিবেশের মূল ভিত্তি। একটি নদী দূষিত হলে তার প্রভাব শুধু স্থানীয় এলাকায় নয়, পুরো বাস্তুতন্ত্রে পড়ে। তরুণ ও স্থানীয় জনগণ একত্র হয়ে নদী রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ দাবি করছে।”

কর্মসূচির এক পর্যায়ে আশপাশের কয়েকজন রিকশাচালক এগিয়ে এসে আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানান। তারা নদী রক্ষার গান গেয়ে প্রতিবাদকারীদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেন। তাদের একজন বলেন, “নদী শুধু পানি নয়, নদী আমাদের জীবনের অংশ। নদী বাঁচলে আমরা বাঁচব।”

২০১৯ সালে হাইকোর্ট এক ঐতিহাসিক রায়ে দেশের সব নদ-নদীকে ‘জীবন্ত সত্তা’ হিসেবে ঘোষণা করে এবং জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনকে এর অভিভাবক হিসেবে দায়িত্ব দেয়। আন্দোলনকারীরা বলেন, এই আইনি স্বীকৃতি বাস্তবে কার্যকর না হলে নদী রক্ষা সম্ভব হবে না।

পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, গত ২১ ও ২২ ফেব্রুয়ারি রাসায়নিক বর্জ্যের কারণে ফুলজোড় নদীর পানি বিষাক্ত হয়ে মাছ, সাপ, ব্যাঙ, কাঁকড়া ও শামুকসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণীর মৃত্যু ঘটে। এর প্রতিবাদে ২৪ ফেব্রুয়ারি ধানগড়ায় মানববন্ধন ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে স্মারকলিপি দেওয়া হয়। পরদিন ২৫ ফেব্রুয়ারি চান্দাইকোনা বাসস্ট্যান্ড এলাকায় একই দাবিতে আরেকটি মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়।

পরবর্তীতে আন্দোলনকারীরা বগুড়ার শেরপুর উপজেলায় এসআর কেমিক্যাল ও মজুমদার কোম্পানির সামনে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ করেন। এ ঘটনায় অংশ নেওয়া কয়েকজনের বিরুদ্ধে শেরপুর থানায় চাঁদাবাজির মামলা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন আন্দোলনকারীরা।

গত রোববার রাত সাড়ে ১০টার দিকে শেরপুর উপজেলার সীমাবাড়ি ইউনিয়নের বাজার এলাকা থেকে পুলিশ তৌহিদুর রহমান ওরফে বাবু (৪৫) ও আলী রেজা বিশ্বাস (৫০) নামে দুজনকে গ্রেপ্তার করে। পরদিন সোমবার দুপুরে তাদের বগুড়ার আদালতে পাঠানো হয় এবং বিকেলে জামিন মঞ্জুর করা হয়।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button