ফুলজোড়–করতোয়া নদীর দূষণের প্রতিবাদে ঢাবির রাজু ভাস্কর্যে বিক্ষোভ সমাবেশ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের সামনে ফুলজোড় ও করতোয়া নদীর দূষণের প্রতিবাদে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছেন শিক্ষার্থী, ছাত্রনেতা, মানবাধিকারকর্মী ও তরুণ পরিবেশকর্মীরা। বুধবার বিকেলে অনুষ্ঠিত এ সমাবেশে শিল্পকারখানার বর্জ্যে নদী দূষণের অভিযোগ তুলে জরুরি তদন্ত, পরিবেশ আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন এবং দায়ী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়। একই সঙ্গে নদী রক্ষায় কাজ করা পরিবেশকর্মীদের হয়রানি বন্ধের আহ্বান জানান আন্দোলনকারীরা।
পরিবেশবাদী সংগঠন ইয়ুথনেট গ্লোবালের নির্বাহী সমন্বয়কারী সোহানুর রহমানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত সমাবেশে বক্তব্য দেন বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্রের (ক্যাপস) চেয়ারম্যান আহমেদ কামরুজ্জামান মজুমদার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) কার্যনির্বাহী সদস্য হেমা চাকমা, লেখক মাহবুব সিদ্দিক, পরিবেশ কর্মী জাকিয়া শিশির, ফয়সাল বিশ্বাস । আরও বক্তব্য দেন কবি সুফিয়া কামাল হলের ডাকসু সাধারণ সম্পাদক মোছা. রুকু খাতুনসহ অন্য ছাত্রনেতা ও অধিকারকর্মীরা।
সমাবেশে বক্তারা বলেন, শিল্পকারখানার বর্জ্যে ফুলজোড় ও করতোয়া নদীর পানি দূষিত হয়ে পড়ছে। এতে আশপাশের পরিবেশের পাশাপাশি কৃষি, মৎস্যসম্পদ এবং স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকা মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে। ভূমি দখল ও শিল্প দূষণের কারণে বহু পরিবার ইতিমধ্যে সংকটে পড়েছে বলেও তারা উল্লেখ করেন।
প্রায় ৫৫ কিলোমিটার দীর্ঘ ফুলজোড় নদীর দুই তীরে সিরাজগঞ্জ ও বগুড়া জেলার কয়েক লাখ মানুষ জীবিকার জন্য নদীটির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু শিল্পবর্জ্যের কারণে নদীর পানি দূষিত হয়ে পড়ছে এবং জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়ছে। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, বগুড়া–৫ আসনের সংসদ সদস্য গোলাম মোহাম্মদ সিরাজের পরিবারের মালিকানাধীন এসআর কেমিক্যালস ও মজুমদার প্রোডাক্টসসহ কয়েকটি শিল্পকারখানার রাসায়নিক বর্জ্যের কারণে ফুলজোড় ও করতোয়া নদী মারাত্মক দূষণের শিকার হচ্ছে।
সমাবেশে অংশ নেওয়া সিরাজগঞ্জের তরুণ পরিবেশকর্মী ফয়সাল বিশ্বাস বলেন, “নদী আমাদের জীবনপ্রবাহ। নদী দূষণ বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে আমরা শুধু পরিবেশগত বিপর্যয় নয়, আমাদের জীবিকাও হারাব। আমি ছয় দিন ধরে এখানে অবস্থান কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছি। নদী নিরাপদ না হওয়া পর্যন্ত আমরা আন্দোলন চালিয়ে যাব।”
ইয়ুথনেট গ্লোবালের নির্বাহী সমন্বয়কারী সোহানুর রহমান বলেন, “নদী জীবন্ত সত্তা। শিল্পবর্জ্যের দূষণ আমাদের নদীগুলোকে ধ্বংস করছে এবং বাস্তুতন্ত্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। বাংলাদেশের নদীগুলো আমাদের জীবিকা ও পরিবেশের মূল ভিত্তি। একটি নদী দূষিত হলে তার প্রভাব শুধু স্থানীয় এলাকায় নয়, পুরো বাস্তুতন্ত্রে পড়ে।”
২০১৯ সালে হাইকোর্ট এক ঐতিহাসিক রায়ে দেশের সব নদ–নদীকে ‘জীবন্ত সত্তা’ হিসেবে ঘোষণা করে এবং জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনকে এর অভিভাবক হিসেবে দায়িত্ব দেয়। আন্দোলনকারীরা বলেন, এই আইনি স্বীকৃতি বাস্তবে কার্যকর না হলে নদী রক্ষা সম্ভব হবে না।
স্থানীয় জনগণ ও পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, গত ২১ ও ২২ ফেব্রুয়ারি শিল্পকারখানার রাসায়নিক বর্জ্যের কারণে ফুলজোড় নদীর পানি বিষাক্ত হয়ে মাছ, সাপ, ব্যাঙ, কাঁকড়া ও শামুকসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণীর মৃত্যু ঘটে। এর প্রতিবাদে ২৪ ফেব্রুয়ারি সিরাজগঞ্জের ধানগড়ায় মানববন্ধন করে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে স্মারকলিপি দেওয়া হয়। পরদিন ২৫ ফেব্রুয়ারি চান্দাইকোনা বাসস্ট্যান্ড এলাকায় একই দাবিতে আরেকটি মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়।
পরে আন্দোলনকারীরা বগুড়ার শেরপুর উপজেলায় এসআর কেমিক্যাল ও মজুমদার কোম্পানির সামনে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ করেন। এ ঘটনায় আন্দোলনে অংশ নেওয়া কয়েকজনের বিরুদ্ধে শেরপুর থানায় চাঁদাবাজির মামলা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তারা।
গত ১ মার্চ রাত সাড়ে ১০টার দিকে শেরপুর উপজেলার সীমাবাড়ি ইউনিয়নের বাজার এলাকা থেকে পুলিশ তৌহিদুর রহমান ওরফে বাবু (৪৫) ও কলেজ প্রভাষক আলী রেজা বিশ্বাসকে গ্রেপ্তার করে। পরদিন তাঁদের বগুড়ার আদালতে পাঠানো হলে বিকেলে জামিন মঞ্জুর করা হয়।
এরই ধারাবাহিকতায় গত ৫ মার্চ ইয়ুথনেট গ্লোবালের উদ্যোগে জাতীয় প্রেস ক্লাবে একটি সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। পরদিন ৬ মার্চ বগুড়ার আদিবাসী মাহাতো সম্প্রদায়ের নেতা, নারী ও শিশুরা পরিবেশকর্মীদের সঙ্গে ঢাকায় এসে রাজু ভাস্কর্যের সামনে বিক্ষোভ সমাবেশ করেন। একই সময় সিরাজগঞ্জের পরিবেশকর্মী ফয়সাল বিশ্বাস ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে ছয় দিন ধরে অবস্থান কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছেন।
সমাবেশে অংশ নেওয়া পরিবেশকর্মীরা বলেন, নদী রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে আন্দোলন আরও বিস্তৃত করা হবে। নদী, পরিবেশ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থে এই আন্দোলনে তরুণদের অংশগ্রহণ আরও জোরদার হবে বলেও তারা উল্লেখ করেন।




