অর্থ ও বাণিজ্যবিশেষ খবর

আর্থিক খাত দৃশ্যমান অগ্রগতি অর্জন করছে : গভর্নর

 

নভেম্বর, ২০২৫ (বাসস) : বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর বলেছেন, গভীর কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশের আর্থিক খাত সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, বৈদেশিক খাত ব্যবস্থাপনা এবং শাসন ব্যবস্থা সংস্কারে দৃশ্যমান অগ্রগতি অর্জন করছে।

আজ শনিবার রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত ‘চতুর্থ বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সম্মেলন: অর্থনীতির ভবিষ্যৎ রূপরেখা ও রাজনৈতিক অঙ্গীকার’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন। দৈনিক বণিক বার্তা এ সম্মেলনের আয়োজন করে।

গভর্নর বলেন, মূল্যস্ফীতি কমানোর পূর্বশর্ত হিসেবে বিনিময় হার সফলভাবে স্থিতিশীল করা হয়েছে। আমি দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে মার্কিন ডলারের বিপরীতে টাকার বিনিময় হার ১২০ থেকে ১২২.৫০ টাকার মধ্যে স্থিতিশীল রয়েছে, যেখানে অনেক আঞ্চলিক মুদ্রার অবমূল্যায়ন আরও বেশি হয়েছে।

তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমানে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে কোনো হস্তক্ষেপের প্রয়োজন নেই। চাহিদা ও যোগানের ভিত্তিতেই হার নির্ধারিত হচ্ছে।

ড. আহসান এইচ মনসুর জানান, পূর্বে বাংলাদেশে বিনিয়োগ কমিয়ে দেওয়া বিদেশি ব্যাংকগুলো স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফিরে এসেছে এবং বৈদেশিক পরিশোধ বকেয়া সম্পূর্ণ নিষ্পত্তি হয়েছে। চলতি হিসাবের ঘাটতি উল্লেখযোগ্যহারে কমেছে এবং আর্থিক হিসাব সামান্য ইতিবাচক অবস্থানে গেছে। আমাদের বৈদেশিক খাত স্থিতিশীল এবং ঝুঁকিপূর্ণ নয়।

ব্যাংক খাতে ডলার সংকট নেই উল্লেখ করে গভর্নর বলেন, সব ধরনের আমদানি মার্জিন শর্ত প্রত্যাহার করা হয়েছে।

তিনি জানান, রমজানের প্রয়োজনীয় পণ্যের জন্য ইতোমধ্যে এলসি খোলা হয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় অনেক ক্ষেত্রে ২০ শতাংশ বেশি। পাশাপাশি চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আমদানির পরিমাণ গত অর্থবছরে রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। চলতি বছরও দ্বি-অঙ্কের প্রবৃদ্ধি বজায় রয়েছে।

তবে উচ্চমাত্রার খেলাপি ঋণকে (এনপিএল) তিনি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেন। নতুন শ্রেণিবিন্যাস নীতি ও হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী এনপিএল হার প্রায় ৩৫ শতাংশে দাঁড়াতে পারে বলে জানান গভর্নর। এ সমস্যা সমাধানে ৫ থেকে ১০ বছর সময় লাগবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় মূল্যস্ফীতি না কমায় সুদের হার এখনো উচ্চমাত্রায় রয়েছে। আমানতের হার ইতোমধ্যেই প্রায় ১০ শতাংশে পৌঁছেছে এবং ইতিবাচক প্রকৃত রিটার্ন নিশ্চিত করতে তা আরও বাড়তে পারে।

গভীর কাঠামোগত দুর্বলতার দিক ইঙ্গিত করে গভর্নর বলেন, শক্তিশালী বন্ড মার্কেটের অভাব, দুর্বল শেয়ারবাজার ও দুর্বল বীমা খাতের কারণে বাংলাদেশের আর্থিক খাত অতিমাত্রায় ব্যাংকনির্ভর হয়ে আছে।

দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের জন্য কেবল ব্যাংকের ওপর নির্ভর না করে বন্ড বাজারকে কাজে লাগাতে ব্যবসায়ীদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

গভর্নর ১৪টি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠনসহ ইসলামী ব্যাংকের মতো বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সুশাসন জোরদার করতে বড় ধরনের সংস্কারের কথা তুলে ধরেন।

মূল নিয়ন্ত্রক সংস্কারের মধ্যে রয়েছে- কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্য বৃহত্তর স্বায়ত্তশাসন, ব্যাংকের বোর্ডে স্বাধীন পরিচালক সংখ্যা ৫০ শতাংশে উন্নীতকরণ, পারিবারিক মালিকানা ১০ শতাংশে সীমাবদ্ধ করা, আমানত বীমা স্কিম শক্তিশালী করা (কাভারেজ বাড়িয়ে দুই লাখ টাকা), দেউলিয়া আইন আধুনিকায়ন এবং অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি গঠন।

তিনি বলেন, পাঁচটি দুর্বল ব্যাংককে একীভূত করে ৩৫ হাজার কোটি টাকা পরিশোধিত মূলধনসহ একটি নতুন শক্তিশালী ব্যাংক গঠন করা হবে। পাশাপাশি, নয়টি নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান ধীরে ধীরে বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে।

গভর্নর আশা প্রকাশ করেন, পরবর্তী সরকার একটি শক্তিশালী এবং আরও স্থিতিশীল আর্থিক খাত গড়ে তোলার জন্য এই সংস্কারগুলো অব্যাহত রাখবে।

অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক (ডিজি) ড. এ কে এনামুল হক বলেন, ব্যাপক বেকারত্বই গণঅভ্যুত্থানের মূল কারণ। তাই কর্মসংস্থান সৃষ্টি অর্থনীতির মৌলিক অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।

অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ (এবিবি)-এর চেয়ারম্যান এবং সিটি ব্যাংক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মাসরুর আরেফিন বলেন, বৈদেশিক মুদ্রা বাজার এখন সম্পূর্ণরূপে চাহিদা ও সরবরাহ চালিত। বাজার এখন স্বাভাবিক নিয়মে চলতে শুরু করেছে।

আরেফিন বলেন, আর্থিক অন্তর্ভুক্তির জন্য বাংলাদেশ অত্যন্ত ‘উর্বর’ একটি দেশ। ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার জন্য সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর প্রশংসার দাবিদার।

বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএসএমএ)- এর সভাপতি এবং জিপিএইচ গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম বলেন, গত পাঁচ-ছয় বছরে দেশের অর্থনীতি নানা সংকটের সম্মুখীন হয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে মহামারী, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, রাজনৈতিক অস্থিরতা, ভয়াবহ বন্যা এবং সর্বশেষ গণঅভ্যুত্থান।

তিনি বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতি সহায়তা উদ্যোক্তাদের স্বল্পমেয়াদে কিছুটা স্বস্তি দিয়েছে। তবে তাদের দীর্ঘমেয়াদি সহায়তা প্রয়োজন।

কর-জিডিপি অনুপাত বৃদ্ধি, নীতি সুদহার কমানো, বন্ড ও ইকুইটি বাজার উন্নয়নের মাধ্যমে পুঁজিবাজার শক্তিশালী করা এবং ক্যাশলেস লেনদেন আরও বাড়ানোর পক্ষে মত দেন তিনি।

এফবিসিসিআই’র সাবেক সভাপতি ও হা-মীম গ্রুপের চেয়ারম্যান একে আজাদ আশা প্রকাশ করেন, পরবর্তী সরকার বেসরকারি খাতের সঙ্গে আরও বেশি পরামর্শের মাধ্যমে অর্থনীতিকে এগিয়ে নেবে।

তিনি বিনিয়োগ প্রবাহ বৃদ্ধি এবং অধিক কর্মসংস্থান সৃষ্টির ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button