মানব পাচারের ক্ষেত্রে নতুন আইনেও সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড

মে, ২০২৬ (বাসস) : গত ১২ মাসে বাংলাদেশ বর্ডার গার্ড (বিজিবি) দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্ত এলাকা থেকে ৪৯৫ জন নারী ও শিশুকে উদ্ধার করে।
বিজিবির মহেশপুর ব্যাটালিয়ন ও ঝিনাইদহ ব্যাটালিয়ন এই নারী ও শিশুদের সীমান্ত এলাকা থেকে উদ্ধার করেছে।
পরে আইনি সহায়তা ও প্রকৃত অভিভাবকের কাছে পৌঁছে দিতে জাস্টিস অ্যান্ড কেয়ার নামে একটি আন্তর্জাতিক বেসরকারি সংস্থাকে দায়িত্ব দেয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমনে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই সংস্থার সঙ্গে কাজ করে।
পাচারের ফলে সীমান্ত পার হলেই এই মানুষগুলো হয়ে যেতেন অনুপ্রবেশকারী। বেআইনি চোরাচালান চক্রের ফাঁদে মৃত্যুঝুঁকিতে পড়ত তাদের জীবন।
মানবপাচার ও চোরাচালান সংক্রান্ত অপরাধের মাত্রা ক্রমাগত বেড়ে যাওয়ায় সরকার ‘মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালনান প্রতিরোধ ও দমন আইন ২০২৬’ প্রণয়ন করেছে। নতুন আইনে ভুক্তভোগীদের ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা করতে ‘অভিবাসী চোরাচালান’ সংক্রান্ত অপরাধকে আওতাভুক্ত করা হয়েছে। এই আইনেও এককভাবে ও সংঘবদ্ধ মানব পাচারের ক্ষেত্রে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও মৃত্যুদণ্ডের সর্বোচ্চ শাস্তি বহাল রাখা হয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলছে, এই আইন মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান অপরাধের মামলা ও ভুক্তভোগীদের সঠিকভাবে চিহ্নিতকরণে সহায়তা এবং যৌন শোষণ, জোরপূর্বক শ্রম, অপরাধমূলক শোষণ ও দাসত্বও অন্যান্য গুরুতর পাচারের শিকার ভুক্তভোগীদের জন্য আরো কার্যকারী সুরক্ষা নিশ্চিত করবে। পাশাপাশি বাংলাদেশের আইন কাঠামোকেও আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করেছে।
একই সঙ্গে এই আইন মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালনের রাষ্ট্রীয় সংজ্ঞাকে জাতিসংঘের ট্রাফিকিং ইন পারসনস (টিআইপি) প্রোটোকল এবং স্মাগলিং ওফ মাইগ্রেন্ট (এসওএম) প্রোটোকলের সঙ্গে সামঞ্জস্য রক্ষা করবে ।
নতুন এই আইনের মাধ্যমে মানব পাচার অপরাধের প্রকৃতি ও ব্যাপকতা বিবেচনায় নিয়ে তদন্ত সংস্থাসমূহকে আরও শক্তিশালী করা হয়েছে। ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ, সম্পত্তি জব্দ এবং আসামির অনুপস্থিতিতে বিচার করার মতো যুগান্তকারী বিধান এই আইনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এছাড়া অভিবাসী চোরাচালানের উদ্দেশ্যে পাসপোর্ট বা ভিসা জালিয়াতিকেও কঠোর শাস্তিমূলক অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।
সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী এই আইন সম্পর্কে বলেন, ‘মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান বর্তমানে একটি বৈশ্বিক সমস্যা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বাংলাদেশ এই সমস্যা সমাধানে অত্যন্ত আন্তরিক এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী আইন প্রণয়নে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, ২০০০ সালে গৃহীত জাতিসংঘ কনভেনশন এবং এর সম্পূরক প্রোটোকলগুলোর আলোকে বাংলাদেশ সরকার ‘মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন আইন, ২০২৬’ প্রণয়ন করেছে।’
মনজুর মোর্শেদ আরও বলেন, ‘নতুন এই আইনে পাচারকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থার পাশাপাশি ভিকটিমদের সুরক্ষা ও অধিকার নিশ্চিতকরণে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে অনলাইন প্রতারণা, স্ক্যামিং এবং মুক্তিপণ আদায়ের মতো আধুনিক অপরাধগুলোকে এই আইনের আওতায় আনা হয়েছে। মানব পাচার প্রতিরোধে কেবল কঠোর আইনই যথেষ্ট নয়, বরং জনসচেতনতা সৃষ্টিতে গণমাধ্যম কর্মীদের বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করতে হবে।’
এই আইনে অপরাধের ধরন অনুযায়ী শাস্তির বিধানেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। পাচারকারীকে সম্পত্তি ব্যবহার করতে দিলে বা নথি গোপন করে সহায়তা করলে ৩ থেকে ৭ বছরের কারাদণ্ড এবং সর্বনিম্ন ৩০ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।
যৌন শোষণের উদ্দেশ্যে কাউকে আমদানি বা স্থানান্তর করলে ৩ থেকে ১০ বছরের কারাদণ্ড এবং সর্বনিম্ন ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হবে। অনলাইনে চাকরির ভুয়া বিজ্ঞাপন বা অভিবাসনের নামে প্রতারণা করলে ৩ থেকে ৭ বছরের কারাদণ্ডের বিধান যুক্ত হয়েছে।
এছাড়া তদন্তকারী কর্মকর্তারা এখন পাচারকারীদের ব্যাংক হিসাব জব্দ ও আয়-সম্পদ যাচাইয়ে ২০১২ সালের মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারবেন। এমনকি মানব পাচার ট্রাইব্যুনাল এখন পাচার সংশ্লিষ্ট অন্যান্য অপরাধের (যেমন: আঘাত, মাদক পাচার বা যৌন সহিংসতা) বিচারও একই সঙ্গে করতে পারবে, যা আগে আলাদা আদালতে করতে হতো।
বিদেশে অবস্থিত সম্পদ জব্দ বা বাজেয়াপ্ত করতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আরও জোরদার করা হয়েছে।
ভুক্তভোগী বা সাক্ষীকে হুমকি দিলে ৩ থেকে ৭ বছর এবং আপস করতে বাধ্য করলে ২ থেকে ৫ বছর পর্যন্ত সশ্রম কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। পাচারের শিকার থাকাকালীন ভুক্তভোগী যদি অনিচ্ছাকৃতভাবে কোনো নির্দিষ্ট অবৈধ কাজ (যেমন: জাল পাসপোর্ট বহন বা অনুপ্রবেশ) করে ফেলে, তবে তাকে আসামি হিসেবে গণ্য না করার বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়েছে।
এছাড়া আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা ভুক্তভোগীদের অবস্থা পর্যবেক্ষণে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের প্রতি ৬ মাস অন্তর প্রতিবেদন দাখিলের বাধ্যবাধকতা দেওয়া হয়েছে।




