বিশেষ খবরবিশ্ব

ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ অবসানে আলোচনা ব্যর্থ : ভ্যান্স

 

এপ্রিল, ২০২৬ (বাসস) : মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ অবসানে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে পারেনি বলে জানিয়েছেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। ইসলামাবাদে দীর্ঘ আলোচনার পর রোববার তিনি বলেন, তেহরানকে ‘চূড়ান্ত ও সর্বোত্তম প্রস্তাব’ দিয়ে তিনি ফিরে যাচ্ছেন।

ইসলামাবাদ থেকে এএফপি জানায়,ভ্যান্স বলেন, ওয়াশিংটন ইরানের কাছ থেকে একটি ‘মৌলিক অঙ্গীকার’ চাইছিল—যাতে তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না। কিন্তু ১৯৭৯ সালের ইরানি ইসলামি বিপ্লব-এর পর দুই পক্ষের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ের এই বৈঠকেও এমন অঙ্গীকার পাওয়া যায়নি।

তবে তিনি ইঙ্গিত দেন, যুক্তরাষ্ট্র এখনো ইরানকে প্রস্তাবটি বিবেচনার জন্য সময় দিচ্ছে। গত মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছিল, আলোচনা চলাকালে ইসরাইলের সঙ্গে দুই সপ্তাহের জন্য হামলা স্থগিত রাখা হবে।

আলোচনার আয়োজক পাকিস্তান জানিয়েছে, তারা সংলাপ অব্যাহত রাখতে সহায়তা করবে এবং উভয় পক্ষকে অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছে।

ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবি বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের ‘অযৌক্তিক দাবি’র কারণে আলোচনা স্থবির হয়ে পড়ে। তবে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র পরে বলেন, ৪০ দিনের যুদ্ধের পর এক বৈঠকেই চুক্তি হবে—এমন আশা কেউই করেনি।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানে হামলা চালালে তেহরান পাল্টা প্রতিক্রিয়া দেখায়, যা মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে সংঘাত ছড়িয়ে দেয় এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অস্থিরতা তৈরি করে।

আলোচনায় দুই পক্ষই কঠোর অবস্থান নিয়ে অংশ নেয়। হরমুজ প্রণালীতে মাইন অপসারণে মার্কিন পদক্ষেপ নিয়েও চাপ তৈরি হয়। এই প্রণালী দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল পরিবহন করা হয়।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আলোচনার মাঝেই দাবি করেন, ইরানি নেতাদের হত্যা ও গুরুত্বপূর্ণ সামরিক অবকাঠামো ধ্বংসের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে ‘যুদ্ধক্ষেত্রে জয়ী’ হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘চুক্তি হোক বা না হোক, তাতে আমার কিছু যায় আসে না—কারণ আমরা জিতেছি।’

প্রায় ২১ ঘণ্টা আলোচনা শেষে ভ্যান্স বলেন, এখনো কোনো চুক্তি সম্ভব হয়নি।

‘আমরা একটি সহজ প্রস্তাব রেখে যাচ্ছি—এটাই আমাদের চূড়ান্ত ও সর্বোত্তম প্রস্তাব। ইরান তা গ্রহণ করে কি না, সেটাই এখন দেখার বিষয়,’ বলেন তিনি।

পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার বলেন, তার দেশ ভবিষ্যতেও সংলাপ এগিয়ে নিতে ভূমিকা রাখবে এবং যুদ্ধবিরতি বজায় রাখা জরুরি।

আলোচনায় ইরানের ৭০ সদস্যের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ। মার্কিন দলে ছিলেন স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনার।

চুক্তির পথে প্রধান বাধা

যুদ্ধ শেষের যেকোনো চুক্তির জন্য ইরানের শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে—নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা সম্পদ মুক্ত করা এবং লেবাননে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ইসরাইলের যুদ্ধ বন্ধ করা। তবে ভ্যান্স স্পষ্ট করেছেন, ইসলামাবাদে এসব বিষয় আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত নয়।

হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়াও বড় বিরোধের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যুদ্ধ চলাকালে এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ নিয়ন্ত্রণ করে ইরান বৈশ্বিক অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করেছে।

শনিবার মার্কিন সামরিক বাহিনী জানায়, দুটি যুদ্ধজাহাজ প্রণালীতে প্রবেশ করে মাইন অপসারণের কাজ শুরু করেছে। তবে ইরান তা অস্বীকার করে এবং সতর্ক করে দিয়েছে, এমন কিছু হলে তারা প্রতিক্রিয়া জানাবে।

ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর নৌ কমান্ড জানায়, যুদ্ধবিরতির সময় নিরাপদ চলাচলের নিশ্চয়তা কেবল ‘নির্দিষ্ট শর্তে বেসামরিক জাহাজের’ জন্য প্রযোজ্য।

ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা নিজেরা ব্যবহার না করলেও প্রণালী খুলে দেব, কারণ অনেক দেশ এটি ব্যবহার করে—তারা হয় ভীত, নয় দুর্বল, নয়তো কৃপণ।’

লেবানন ইস্যুতে জটিলতা

গালিবাফ বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার অভিজ্ঞতা সবসময়ই ‘ব্যর্থতা ও ভঙ্গ প্রতিশ্রুতি’ দিয়ে চিহ্নিত।

অন্যদিকে ভ্যান্স বলেন, ইরান সদিচ্ছা দেখালে যুক্তরাষ্ট্রও আন্তরিকভাবে আলোচনা করবে, তবে ‘খেলতে চাইলে’ তা গ্রহণযোগ্য হবে না।

সবচেয়ে বড় জটিলতা তৈরি হয়েছে লেবানন ইস্যুতে। ইসরাইল বলছে, যুদ্ধবিরতি লেবাননের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। সেখানে হিজবুল্লাহর হামলার জবাবে ইসরাইল ব্যাপক বিমান হামলা ও স্থল অভিযান চালাচ্ছে।

লেবাননের কর্তৃপক্ষ জানায়, শনিবার দেশটির দক্ষিণাঞ্চলে ইসরাইলি হামলায় ১৮ জন নিহত হয়েছে। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে মোট মৃতের সংখ্যা ২ হাজার ছাড়িয়েছে।

ইসরাইল ও লেবানন আগামী সপ্তাহে ওয়াশিংটনে পৃথক আলোচনা করবে। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, তিনি এমন একটি শান্তিচুক্তি চান, যা ‘প্রজন্মের পর প্রজন্ম টিকে থাকবে’।

তবে হিজবুল্লাহর সঙ্গে যুদ্ধবিরতি করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে ইসরাইল ইঙ্গিত দিয়েছে, তারা বরং বৈরুতের কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর চাপ বাড়াবে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button