শীর্ষ নিউজ

ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় এক টুকরো স্বস্তি : আদালতপাড়ার ন্যায়কুঞ্জ

 

 

জুন, ২০২৬ (বাসস): সকাল হওয়ার আগেই মানুষের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে রাজধানীর আদালতপাড়া। পুরোনো ভবনের করিডোর, এজলাসের সামনে, সিঁড়ির ধাপ, খোলা আঙিনা—সব জায়গাজুড়ে অপেক্ষমাণ মানুষের ভিড়। কেউ মামলার বাদী, কেউ বিবাদী, কেউ সাক্ষী। আবার কেউ এসেছেন প্রিয়জনের জামিনের খোঁজে, কেউ জমিজমা নিয়ে বিরোধের শুনানিতে, কেউ বা বহুদিন ধরে চলা মামলার পরবর্তী তারিখ জানতে।

দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা এসব মানুষের কাছে আদালতে একটি দিন মানেও দীর্ঘ অপেক্ষা। কখন ডাক পড়বে, কখন শুনানি হবে, কখন আইনজীবীর সঙ্গে দেখা হবে-অনিশ্চয়তায় কাটে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। এতদিন সেই অপেক্ষার বড় অংশ কেটেছে বারান্দায় দাঁড়িয়ে, সিঁড়িতে বসে কিংবা রোদের মধ্যে আশ্রয় খুঁজে।

কিন্তু সেই চিরচেনা দৃশ্যের মাঝেই দারুণ এক সংযোজন ঘটেছে ঢাকা জেলা ও মহানগর দায়রা জজ আদালত প্রাঙ্গণে। নাম ‘ন্যায়কুঞ্জ’। নামের মধ্যেই যেন লুকিয়ে আছে এর উদ্দেশ্য-ন্যায়বিচারের প্রত্যাশায় আসা মানুষদের জন্য এটি একটি স্বস্তির আশ্রয়।

২০২৩ সালের ১৩ জুলাই তৎকালীন প্রধান বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী এই ন্যায়কুঞ্জের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। পরে ২০২৪ সালের ২৬ নভেম্বর তৎকালীন ঢাকা জেলা ও দায়রা জজ মো. হেলাল উদ্দিন এটির উদ্বোধন করেন।

এরপর ধীরে ধীরে বিচারপ্রার্থী, আইনজীবী, সাংবাদিক ও আদালতসংশ্লিষ্ট মানুষের কাছে এটি একটি পরিচিত ও প্রয়োজনীয় স্থানে পরিণত হয়েছে।

ঢাকা জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পুরোনো ভবন এবং মহানগর দায়রা জজ আদালতের মাঝামাঝি স্থানে অবস্থিত ন্যায়কুঞ্জে প্রবেশ করলেই চোখে পড়বে পরিচ্ছন্ন ও পরিপাটি পরিবেশ। ২৩টি স্টিলের সোফায় একসঙ্গে ৬৯ জন বসার সুযোগ রয়েছে। বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা, সিসিটিভি ক্যামেরা, পর্যাপ্ত আলো ও ফ্যানের সুবিধা বিচারপ্রার্থীদের জন্য নিরাপদ ও আরামদায়ক পরিবেশ তৈরি করেছে।

ছবি: বাসস
ছবি: বাসস

টিনশেড ভবন হলেও এর নিচে তাপ নিয়ন্ত্রণের জন্য ইনসুলেটর ব্যবহার করা হয়েছে। ফলে গরমের দিনেও ভেতরে তুলনামূলক স্বস্তিদায়ক পরিবেশ বজায় থাকে। টাইলস করা মেঝে, চলাচলের প্রশস্ত পথ এবং সুপরিকল্পিত বসার ব্যবস্থা স্থানটিতে আলাদা মাত্রা যোগ করেছে।

ন্যায়কুঞ্জের অন্যতম মানবিক দিক হলো—মাতৃদুগ্ধ কর্নার। আদালতে আসা অনেক নারীকে শিশু সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে দীর্ঘ সময় কাটাতে হয়। তাদের জন্য নিরিবিলি ও নিরাপদ পরিবেশে শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানোর ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। পাশে রয়েছে বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা এবং স্টিলের মগ। আদালতপাড়ার মতো ব্যস্ত স্থানে এমন উদ্যোগ অনেক নারী বিচারপ্রার্থীর জন্য স্বস্তির কারণ হয়ে উঠেছে।

ভবনের ভেতরে ৬৯ জনের বসার ব্যবস্থা রয়েছে। তবে এর চারপাশে কংক্রিটের বেঞ্চ নির্মাণ এবং টিনের ছাউনি সম্প্রসারণ করায় আরও অনেক মানুষ সেখানে বসে বিশ্রাম নিতে পারেন। দিনের বিভিন্ন সময়ে দেখা যায় কেউ মামলার নথি হাতে নিয়ে অপেক্ষা করছেন, কেউ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলছেন, আবার কেউ দীর্ঘ যাত্রার ক্লান্তি কাটাতে কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে বসে আছেন।

একটি মামলায় সাক্ষ্য দিতে আসা ৬০ বছর বয়সী জাহিদ মিয়ার কথায় স্পষ্ট ফুটে উঠেছে এই পরিবর্তনের মূল্য। তিনি বলেন, ‘আগে সিঁড়িতে বসলে উঠিয়ে দিত। কখনও রোদে দাঁড়িয়ে থাকতে হত, কখনও বারান্দায় জায়গা খুঁজতে হত। আজ চেয়ারে বসে পানি খেতে পেরেছি। এই চেয়ারটা আমার কাছে অনেক দামি।’

একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানালেন বিচারপ্রার্থী সামিয়া জাহান। ছোট সন্তান কোলে নিয়ে আদালতে আসাটা তার জন্য ছিল বাড়তি কষ্টের।

তিনি বলেন, ‘আগে বাচ্চা নিয়ে বারান্দার কোণে বসতাম। মেয়েকে খাওয়ানোরও সমস্যা হত। এখন ন্যায়কুঞ্জে বসে নিশ্চিন্তে মেয়েকে খাওয়াতে পারছি। আদালতে এসে এই প্রথম একটু শান্তি পেলাম।’

শুধু বিচারপ্রার্থীরাই নন, আইনজীবীদের জন্যও ন্যায়কুঞ্জ একটি কার্যকর কর্মপরিসর তৈরি করেছে। আদালতের ব্যস্ত সময়সূচির মধ্যে মক্কেলদের সঙ্গে আলোচনা, নথিপত্র পর্যালোচনা কিংবা মামলার কৌশল নিয়ে কথা বলার জন্য নিরিবিলি পরিবেশের প্রয়োজন হয়। ন্যায়কুঞ্জ সেই প্রয়োজন পূরণ করছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

ঢাকা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক কালাম খান বলেন, ‘বছরের পর বছর আমাদের মক্কেলরা বারান্দায় দাঁড়িয়ে থেকেছেন। ন্যায়কুঞ্জ সেই কষ্ট অনেকটাই কমিয়েছে। তবে এখানে একটি তথ্য সহায়তা ডেস্ক এবং কজলিস্ট প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা গেলে মানুষ আরও উপকৃত হবে।’

আদালতকেন্দ্রিক সংবাদ সংগ্রহে নিয়োজিত সাংবাদিকদের কাছেও ন্যায়কুঞ্জ একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান হয়ে উঠেছে।

গণমাধ্যমকর্মী আশিকুজ্জামান আশিক বলেন, ‘আদালতপাড়ায় কাজের চাপ অনেক। এখন এখানে বসে তথ্য যাচাই, নোট প্রস্তুত বা সহকর্মীদের সঙ্গে আলোচনা করা যাচ্ছে। একই সঙ্গে অপেক্ষমাণ মানুষদের নানা গল্প ও অভিজ্ঞতা জানার সুযোগও তৈরি হয়েছে।’

প্রতিদিন সকাল সাড়ে ৮টায় ন্যায়কুঞ্জের গেট খোলা হয় এবং বিকেল ৫টায় বন্ধ করা হয়। পরিচ্ছন্নতাকর্মী মাসুম দাস জানান, সকাল থেকেই বিচারপ্রার্থীরা সেখানে আসতে শুরু করেন।

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা পানি, ফ্যানসহ সবকিছু ঠিক রাখার চেষ্টা করি। মানুষ একটু বসতে পারলেই খুশি হয়।’

আদালত মানেই সাধারণ মানুষের কাছে উদ্বেগ, অনিশ্চয়তা ও দীর্ঘ প্রতীক্ষার জায়গা। সেই পরিবেশে ন্যায়কুঞ্জ কোনো মামলার রায় বদলে দিতে সহায়তা করে না কিংবা বিচারপ্রক্রিয়াও ত্বরান্বিত করে না।

কিন্তু অপেক্ষমাণ বিচারপ্রার্থীদের জন্য এটি এনে দিয়েছে একটুখানি স্বস্তি, একটুখানি মর্যাদা এবং মানবিকতার স্পর্শ। আর সে কারণেই আদালতপাড়ার ব্যস্ততার মাঝেও ন্যায়কুঞ্জ এখন অনেকের কাছে শুধু একটি স্থাপনা নয়, ন্যায়বিচারের পথে হাঁটা মানুষের ক্ষণিকের প্রশান্তির ঠিকানাও।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button