
সেপ্টেম্বর, ২০২৬ (বাসস): বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আজ। ১৯৭৮ সালের এই দিনে প্রতিষ্ঠার পর থেকেই লড়াই, সংগ্রাম, অর্জন ও রাজনৈতিক অভিযাত্রার এক দীর্ঘ পথ অতিক্রম করেছে দলটি। গত ৪৮ বছর ধরে বহু ঝড়-ঝঞ্ঝা, প্রতিকূলতা ও কঠিন সময় পেরিয়ে বিএনপি আজ দেশের জনগণের আস্থায় এক অদম্য এবং অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। শত বাধা ও কঠিন পথ পেরিয়ে বারবার ঘুরে দাঁড়ানোর এক অনন্য ইতিহাস গড়েছে বিএনপি।
২০০৬ সালে ক্ষমতা ছাড়ার পর থেকেই একের পর এক প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হয়েছে বিএনপিকে। ২০০৭ সালের বিতর্কিত ওয়ান-ইলেভেনের সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় থেকে দলটির ওপর দুর্যোগের মেঘ ঘনীভূত হয়। ওই সময় দল ভাঙার চেষ্টা থেকে শুরু করে শীর্ষ নেতাদের কারাবরণ, সব মিলিয়ে চরম সংকটে পড়েছিল মহান মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার ও স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের হাতে গড়া বিএনপি।
২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারের ফ্যাসিবাদী শাসনামলে রাজপথে চরম দমন-পীড়নের শিকার হতে হয়েছে বিএনপির নেতাকর্মীদের। এই সময়ে দলের কয়েক লাখ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে হাজার হাজার ‘মিথ্যা’ ও ‘গায়েবি’ মামলা দেওয়া হয়েছে। রাজপথের আন্দোলন দমাতে গুম, খুন আর নির্যাতনের খড়্গ নেমে এসেছিল তৃণমূল পর্যন্ত। কিন্তু সব বাধা উপেক্ষা করে দলকে টিকিয়ে রাখাই ছিল নেতৃত্বের বড় সার্থকতা।
২০০৭ সালের বিতর্কিত এক-এগারোর পর গত দুই দশকের প্রতীক্ষা, আন্দোলন আর কণ্টকাকীর্ণ পথ পাড়ি দিয়ে জনগণের বিপুল রায়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরেছে বিএনপি। চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জনগণের বিপুল রায়ে দুই-তৃতীয়াংশ আসনে বিজয়ী হয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের মধ্য দিয়ে পঞ্চম বারের মত সরকার গঠনের সুযোগ লাভ করে বিএনপি।
ক্ষমতায় ফিরে বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রতিহিংসার রাজনীতি পরিহার করে ‘জাতীয় ঐক্য’ গড়ার ডাক দিয়েছেন। ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতিতে জনগণের অধিকার বাস্তবায়নে নানা কার্যক্রম ও কর্মসূচি বাস্তবায়নে এগিয়ে যাচ্ছে বিএনপি সরকার।
বিতর্কিত এক-এগারোর পর ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন একদলীয় নির্বাচন (বিনাভোটে আওয়ামী জোটের ১৫৩ জন সংসদ সদস্য নির্বাচিত), ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগের রাতে আওয়ামী সরকার দলীয় প্রার্থীদের পক্ষে ভোট জালিয়াতি তথা রাতের ভোটের নির্বাচন, ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ‘আমি-ডামি’র নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এসব নির্বাচনে জন রায়ের প্রতিফলন ঘটেনি। অংশগ্রহণ মূলক নির্বাচন না হওয়ায় জনগণ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেনি।
এর আগে সর্বশেষ ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত পূর্ণ মেয়াদে ক্ষমতায় ছিল বিএনপি। ২০০১ সালের ১ অক্টোবর অনুষ্ঠিত অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকার গঠন করে।
দীর্ঘ রাজনৈতিক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে বিএনপির এবারের প্রত্যাবর্তন সমসাময়িক রাজনীতির ইতিহাসে ‘ঐতিহাসিক পুনরুত্থান’।
দলটির চেয়ারপার্সন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী মরহুমা বেগম খালেদা জিয়ার জন্য বিতর্কিত এক-এগারোর পর দুই দশক ছিল চরম অগ্নিপরীক্ষার। বিতর্কিত মামলায় তাঁকে কারারুদ্ধ করার পর দলের নেতাকর্মীরা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। এরপর উন্নত চিকিৎসার অভাব এবং দীর্ঘ কারাবাসে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলেও গণতন্ত্র ও জনগণের অধিকার আদায়ের প্রশ্নে তিনি আপসহীন থেকেছেন। এ সময়ে দলের হাল ধরেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেন।
এর আগে থেকে তিনি দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর নেতৃত্ব ও নির্দেশনায় তৃণমূল থেকে কেন্দ্রীয় পর্যায় পর্যন্ত দল সুসংগঠিত হয়ে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও মানুষের অধিকার আদায়ের লড়াই সংগ্রামের কর্মসূচি পালিত হয়।
২০০৮ সালে সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় গ্রেফতার ও কারাবন্দি অবস্থায় অমানবিক নির্যাতনের পর চিকিৎসার প্রয়োজনে দেশ ছাড়েন তারেক রহমান। পরে বিতর্কিত নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর একের পর এক সাজানো ও মিথ্যা মামলায় তারেক রহমানকে সাজা দেওয়া হয়। আদালতকে ব্যবহার করে গণমাধ্যমে তারেক রহমানের বক্তব্য-বিবৃতি প্রচার বন্ধ রাখা হয়।
চব্বিশের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে ফ্যাসিবাদী আওয়ামী সরকারের পতন ঘটে এবং পদত্যাগ করে ভারতে পালিয়ে যান তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
প্রায় ১৭ বছর নির্বাসিত জীবন কাটিয়ে গত বছরের ২৫ ডিসেম্বর স্বদেশে রাজসিক প্রত্যাবর্তন করেন তারেক রহমান। প্রিয় নেতাকে বরণ করতে ওইদিন রাজধানীর পূর্বাচলে লাখ লাখ নেতাকর্মী, সমর্থক আর সাধারণ মানুষ জড়ো হন। তাদের ভালোবাসায় একদিকে তারেক রহমান যেমন সিক্ত হলেন, অন্যদিকে তিনিও দেশের মানুষকে শোনালেন তাঁর স্বপ্নের কথা, তাঁর পরিকল্পনার কথা।
দীর্ঘ দুই দশক ক্ষমতার বাইরে থেকেও দলটির বড় কোনো ভাঙন না হওয়া ছিল এক বিস্ময়কর ঘটনা। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে তারেক রহমান যখন নির্বাসিত জীবনে এবং বেগম খালেদা জিয়া যখন হাসপাতালে, তখনো তৃণমূলের ঐক্য অটুট ছিল।
১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর বিএনপি প্রতিষ্ঠার পর ২০২৬ সাল- বিএনপি ৪৮ বছরের রাজনৈতিক পথ অতিক্রম করেছে। এই দীর্ঘ সময়ে বিএনপি রাষ্ট্রক্ষমতায় থেকেছে, বিরোধী দলে থেকেছে, আন্দোলন করেছে, নির্বাচনে জয়-পরাজয় দেখেছে, রাজনৈতিক সংকট মোকাবিলা করেছে এবং কঠিন রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্যেও সংগঠন হিসেবে টিকে থেকে লড়াই সংগ্রাম অব্যাহত রেখেছে।
বিএনপির যাত্রা
১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেন। বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব, বহুদলীয় গণতন্ত্র এবং জাতীয় ঐক্যের রাজনৈতিক দর্শনকে সামনে রেখে দলটির যাত্রা শুরু হয়। শুরুতে বাংলাদেশ বিনির্মাণে ১৯ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করে দলটি জনগণের বিপুল সমর্থন লাভ করে। প্রতিষ্ঠার পর অল্প সময়ের মধ্যেই বিএনপি দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়।
১৯৭৯ সালে প্রথম নির্বাচনী সাফল্য
১৯৭৯ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি বড় ধরনের বিজয় অর্জন করে। এর মধ্য দিয়ে নবগঠিত দলটি জাতীয় রাজনীতিতে শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করে।
১৯৮১-১৯৮২ সালের কঠিন সময়
১৯৮১ সালের ৩০ মে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ড বিএনপিকে গভীর রাজনৈতিক সংকটে ফেলে। দলের নেতৃত্বে পরিবর্তন আসে। ১৯৮২ সালে সামরিক শাসন প্রতিষ্ঠার পর বিএনপি বিরোধী রাজনীতিতে চলে যায়। শুরু হয় নতুন রাজনৈতিক সংগ্রাম।
১৯৮৩-১৯৯০ সালের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন
আশির দশকজুড়ে বিএনপি স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে ভূমিকা রাখে। বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি রাজপথের আন্দোলনকে সংগঠিত করে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আন্দোলনের সমন্বয়ের মধ্য দিয়ে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবি জোরালো হয়।
তীব্র গণআন্দোলনে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের স্বৈরশাসনের পতন ঘটে। এর মধ্য দিয়ে গণতন্ত্রে উত্তরণের পথ তৈরি হয়। বিএনপির জন্য এটি ছিল দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের একটি বড় রাজনৈতিক অর্জন।



