বিশেষ খবরবিশ্ব

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র পাল্টাপাল্টি হুমকি, নতুন করে হামলা

 

সেপ্টেম্বর, ২০২৬ (বাসস) : কয়েক সপ্তাহের মধ্যে সবচেয়ে তীব্র লড়াইয়ের পর বুধবার ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র পরস্পরকে হুমকি দিয়েছে। এর ফলে যুদ্ধ শুরুর ছয় মাসে মধ্যপ্রাচ্যে দুই চিরশত্রুর অচলাবস্থা আরও গভীর হয়েছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী গত রাতে ইরানের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে ‘খুবই বড় ধরনের হামলা’ চালিয়েছে। তারা চাইলে ‘যেকোনো সময় আবারও’ হামলা চালাতে প্রস্তুত।

তেহরান থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর জানিয়েছে।

ইরানের নিরাপত্তা বিভাগের প্রধান বলেছেন, ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইসলামি প্রজাতন্ত্রটির ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলা দিয়ে শুরু হওয়া এই যুদ্ধে ইরান ‘নতুন কৌশল’ গ্রহণ করেছে।

সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব মোহসেন রেজায়ি এক্সে লিখেছেন, ‘যুদ্ধক্ষেত্রে, কূটনীতিতে এবং অর্থনৈতিক অবরোধ মোকাবিলায় ইরানের নতুন কৌশল আপনার ভিত্তি ধ্বংস করে দেবে—খুব শিগগিরই তা দেখতে পাবেন।’

ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর অঙ্গীকার করেছে ওয়াশিংটন। এ ছাড়া দেশটির মিত্রদের ওপর নিষেধাজ্ঞার হুমকিও দিয়েছে তারা।

জ্বালানি বিষয়ক মন্ত্রী ক্রিস রাইট বুধবার বলেছেন, ইরানের অর্থনৈতিক অংশীদারদের লক্ষ্যবস্তু করে নিষেধাজ্ঞা বাড়ানোর পরিকল্পনা ‘সর্বোচ্চ পর্যায়ের চাপ’ সৃষ্টি করবে।

ট্রাম্প বুধবার পারস্য উপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালীর নাম পরিবর্তন করে ‘ট্রাম্প প্রণালী’ রাখার কথাও বলেছেন। তেহরান গত ছয় মাস ধরে কার্যত এই জলপথটি বন্ধ করে রেখেছে। তবে পরে ট্রাম্প ইঙ্গিত দেন, তিনি বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বলেননি।

ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে এক পোস্টে বলেন, ‘এখন যেহেতু এটি যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে, তাহলে কি হরমুজ প্রণালীর নাম পরিবর্তন করে ট্রাম্প প্রণালী রাখা উচিত?’

মঙ্গলবার ইরানের বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক মার্কিন বোমাবর্ষণের পর ইরান জর্ডান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, বাহরাইন এবং ইরাকের স্বায়ত্তশাসিত কুর্দিস্তান অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা চালায়।

ইরানি রেড ক্রিসেন্ট জানিয়েছে, ইরানের দক্ষিণাঞ্চলে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় চারজন নিহত এবং ৫০ জনের বেশি আহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে একটি শিশুও রয়েছে। এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে তেহরান।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাকাই এক্সে লিখেছেন, ‘এই অবৈধ যুদ্ধের সত্যতা এবং যুদ্ধাপরাধের প্রকৃত চেহারা সিরিক অঞ্চলে দেখা যাচ্ছে। সেখানে আমেরিকার ব্যর্থতা আড়াল করার মরিয়া চেষ্টার অংশ হিসেবে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে নির্মমভাবে বোমা হামলা চালানো হয়েছে।’

মার্কিন সামরিক বাহিনী সরাসরি এ ঘটনার বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।

মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) মুখপাত্র টিম হকিন্স বলেন, ‘ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) মতো যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী কখনো বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্যবস্তু করে না।’

-‘শয়তানের মতো আচরণ’-

ইরানের প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ বিয়ের অনুষ্ঠানে হামলার ঘটনায় ওয়াশিংটনের তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে ‘শয়তান’ বলে অভিহিত করেন।

তিনি এক্সে লিখেছেন, ‘কোনো শক্তি যদি শয়তানের মতো আচরণ করে, শয়তানের মতো লক্ষ্যবস্তু বেছে নেয় এবং শয়তানের মতো হত্যা করে, তাহলে সে শয়তান।’

রোববার ওয়াশিংটন ইরানের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানোর পর সর্বশেষ লড়াই শুরু হয়। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে এটিই ছিল ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম জানা হামলা।

এরপর ইরানি বাহিনী জর্ডান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে মার্কিন সেনাদের লক্ষ্য করে হামলা চালায়। এ ছাড়া দু’টি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলার ঘটনা ঘটে। এসব হামলার দায় কেউ স্বীকার করেনি। সৌদি আরবের একটি জাহাজ চলাচলকারী কোম্পানি জানিয়েছে, এতে দুই ফিলিপিনো নাবিক নিহত হয়েছেন।

ট্রাম্প বলেছেন, হরমুজ প্রণালীতে ইরানের সমুদ্র মাইন পেতে রাখার চেষ্টা এবং জর্ডানের একটি ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার জবাবে যুক্তরাষ্ট্র এসব হামলা চালিয়েছে।

নতুন করে যুদ্ধ শুরু হওয়ায় ইরানিরা দুঃখ প্রকাশ করেছেন।

স্বনির্ভর  ব্যবসায়ী ৫০ বছর বয়সী হোসেইন মোয়াজ্জামি বলেন, হামলার ঘটনা ‘সত্যিই খুব কষ্টদায়ক।’

তিনি বলেন, ‘আমি আশা করি, তারা সবাই আবার আলোচনার টেবিলে ফিরবে। কারণ, এতে শুধু ইরানের জনগণই দুর্ভোগে পড়ছে। আমেরিকানরা পৃথিবীর অন্য প্রান্তে রয়েছে। তাদের কিছুই হচ্ছে না।’

ইরান সরকারের একটি অ্যাকাউন্ট থেকে প্রকাশিত ভিডিওতে সিরিকে বিয়ের অনুষ্ঠানস্থলে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর ধ্বংসাবশেষ ও ক্ষয়ক্ষতি দেখা যায়। ভিডিওতে পেছনে মানুষের চিৎকারের শব্দও শোনা যায়।

রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত এক ভিডিওতে কনে’র বাবা এবং হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত ভবনটির মালিক আলী মাল্লাহী বলেন, ‘এটি অত্যন্ত দুঃখজনক ঘটনা। আল্লাহকে ধন্যবাদ, হতাহতের সংখ্যা আরও বেশি হয়নি।’

২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ইরানে হামলার মধ্য দিয়ে যুদ্ধ শুরু হয়। ওই হামলায় দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন।

এরপর হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঘটনায় একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়ে। এর আগে বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ তেল এই প্রণালীর মধ্য দিয়ে পরিবহন করা হতো।

এদিকে ইসরাইলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী বলেছেন, সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি শুরু হতে যাওয়া ইহুদিদের গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় উৎসবের সময়ে ইরান হামলা চালালে ইসরাইল ‘প্রচণ্ড শক্তি’ দিয়ে জবাব দিতে প্রস্তুত।

ইসরাইলি সংবাদমাধ্যমগুলোর আয়োজিত এক সম্মেলনে ইসরাইলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ বলেন, ‘এখন পর্যন্ত তারা আমাদের ছাড়া পুরো অঞ্চলে হামলা চালাচ্ছে।’

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button