বিশ্বশীর্ষ নিউজ

দ্বিতীয় জীবন’: বন্যায় প্লাবিত টানেলে ১০ দিন বেঁচে থাকার বর্ণনা নেপালি শ্রমিকের

সেপ্টেম্বর, ২০২৬ (বাসস) :  নেপালের জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের শ্রমিক সঞ্জয় সাহ বন্যাকবলিত একটি টানেলের ভেতর ১০ দিন অন্ধকারে কাটিয়েছেন। কাদামিশ্রিত পানি পান করে বেঁচে ছিলেন। উদ্ধারের আশায় মরিয়া হয়ে প্রার্থনা করতে করতে একসময় তিনি সময় সম্পর্কে সম্পূর্ণ ধারণা হারিয়ে ফেলেছিলেন।

খবর বার্তা সংস্থা এএফপি’র।

অবশেষে ৪ সেপ্টেম্বর দুর্যোগ মোকাবিলা দলের সদস্যরা যখন অবশেষে তাকে নিরাপদে উদ্ধার করেন, তখন সঞ্জয়ের করা প্রথম প্রশ্নেই বোঝা যায়, দীর্ঘ এই দুর্বিষহ অভিজ্ঞতা তাকে কতটা মানসিকভাবে বিভ্রান্ত করে ফেলেছিল।

রোববার সপ্তারি জেলায় বাড়ির পথে এএফপিকে ৩০ বছর বয়সী সঞ্জয় বলেন, ‘উদ্ধারের পর আমি প্রথমেই জিজ্ঞেস করেছিলাম, কত দিন হয়েছে? তারা বলল, ১০ দিন। আমার মনে হয়েছিল মাত্র কয়েক দিন হয়েছে।’

চীন-নেপাল সীমান্তে পাহাড়ের হিমবাহ ধসে সৃষ্ট ভয়াবহ বন্যায় গত ২৬ আগস্ট বেশ কয়েকটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সেখানে কর্মরত শত শত শ্রমিকের মধ্যে সঞ্জয়ও ছিলেন।

এই বিপর্যয়ে সাহের অলৌকিকভাবে বেঁচে যাওয়া ছিল এক বিরল আশার খবর। ভয়াবহ ওই দুর্যোগে অন্তত ১ হাজার ৪২৯ জন নিহত এবং ৫ হাজার ৬৪০ জনের বেশি নিখোঁজ হয়েছেন। নিখোঁজ ও নিহতদের বেশিরভাগই নেপালের।

বন্ধু ও স্বজনেরা ফুলের মালা ও কেক নিয়ে তাকে স্বাগত জানানোর সময় কান্না সামলাতে সামলাতে সঞ্জয় বর্ণনা করেন, কীভাবে মুহূর্তের মধ্যে বিপর্যয় নেমে এসেছিল।

তিনি বলেন, ‘আমি দায়িত্বে ছিলাম। হঠাৎ এমন এক বন্যা আমাদের আঘাত করল, যা কল্পনাও করা যায় না। কয়েক মিটার উঁচু ঢেউ যেন সুনামির মতো আছড়ে পড়ছিল।’

বন্যার পানি আসছে— এমন সতর্কবার্তা শ্রমিকরা পেয়েছিলেন। কিন্তু নিরাপদে সরে যাওয়ার জন্য যথেষ্ট সময় পাননি।

সঞ্জয় বলেন, ‘আমাদের সতর্ক থাকতে বলা হয়েছিল, বড় বন্যা আসছে বলে জানানো হয়েছিল। যতটা সম্ভব আমরা সতর্ক ছিলাম এবং সহকর্মীদের সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছিলাম।’

তিনি আরও বলেন, কিন্তু বন্যার পানি আমাদের খুব বেশি সময় দেয়নি। আমরা সবকিছু বন্ধ করে দিয়ে সহকর্মীদের উদ্ধার ও নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছিলাম।

তবে কয়েক মিনিটের মধ্যেই প্রচণ্ড স্রোতের পানিতে পুরো টানেলটি তলিয়ে যায়।

প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, বন্যার ভয়াবহতা ছিল নজিরবিহীন। নেপাল সরকার এর পেছনে হিমালয় অঞ্চলে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির ভয়াবহ প্রভাবের কথাও তুলে ধরেছে।

সহকর্মীদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে সঞ্জয় টানেলের ভেতর আটকা পড়েন। তখন তার জানা ছিল না যে কেউ কখনো তাকে উদ্ধার করতে আসবে কি না।

এই অন্ধকার ও নিঃসঙ্গ সময়ে তার হিন্দু ধর্মবিশ্বাস তাকে মানসিকভাবে শক্তি জুগিয়েছে।

সঞ্জয় বলেন, ‘আমার গভীর বিশ্বাস ও আত্মবিশ্বাসের কারণেই আমি বেঁচে ছিলাম।’

তিনি জানান, ‘আমি মহামন্ত্র জপ করছিলাম। এর মাধ্যমে যে ঈশ্বরীয় শক্তি পেয়েছি, তা আমাকে ভয় ও হতাশায় ভেঙে পড়তে দেয়নি।’

পরিষ্কার পানি না থাকায় যা পাওয়া গেছে, তা দিয়েই তাকে বেঁচে থাকতে হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘পানি ছিল, কিন্তু তা কাদামিশ্রিত। আমি শুধু সেটাই পান করেছি।’

অন্ধকার ও একাকিত্ব ছিল অসহনীয়। তবে সঞ্জয় পুরোপুরি একা ছিলেন না। কাছেই আরেক শ্রমিক ৪৫ বছর বয়সী কবির মহার্জন আটকা পড়েছিলেন।

সঞ্জয় বলেন, ‘আমরা আলাদা ছিলাম, কিন্তু একে অপরের সঙ্গে কথা বলতে পারতাম।’

অন্য একজন মানুষের কণ্ঠস্বর শুনতে পাওয়া তার জন্য ছিল বেঁচে থাকার এক বড় অবলম্বন।

অবশেষে কয়েক দিন ধরে খনন ও কঠিন উদ্ধার অভিযান চালানোর পর উদ্ধারকারীরা আটকে থাকা শ্রমিকদের কাছে পৌঁছাতে সক্ষম হন এবং তাদের জীবিত অবস্থায় বের করে আনেন।

সঞ্জয়ের স্ত্রী লক্ষ্মী কুমারী সাহ জানান, তিনি স্বামীকে আবার দেখতে পাওয়ার আশা ছাড়েননি।

মেয়েকে কোলে নিয়ে তিনি বলেন, ‘সৃষ্টিকর্তা আমাদের সাহায্য করেছেন। আমরা আশা ধরে রেখেছিলাম।’

কাঠমান্ডুর একটি হাসপাতালে কয়েক দিন চিকিৎসা নেওয়ার পর সঞ্জয় এখন বাড়ি ফিরছেন। তবে তার মনে আনন্দের পাশাপাশি গভীর বিষাদও রয়েছে।

তিনি বলেন, ‘আমি আনন্দিত, আবার দুঃখও লাগছে। আমি সেখানে বেঁচে গিয়ে দ্বিতীয় জীবন পেয়েছি। কিন্তু আমাদের অনেক বন্ধু সেখানে ছিল।’

উদ্ধারকারীরা এখনও টানেলগুলোতে তল্লাশি চালিয়ে যাচ্ছেন। অভিযান বন্ধ না করার আহ্বান জানিয়েছেন সঞ্জয়।

তার এক দিন পর, ৫ সেপ্টেম্বর, একজন চীনা শ্রমিককে জীবিত উদ্ধার করা হয়। তবে এরপর থেকে আর কোনো জীবিত ব্যক্তির সন্ধান পাওয়া যায়নি।

সঞ্জয় বলেন, ‘আমি আশা করি সরকার উদ্ধার ও তল্লাশি অভিযান চালিয়ে যাবে। সেখানে এখনও কেউ জীবিত থাকতে পারে।’

তিনি আরও বলেন, ‘অথবা সেখানে যারা মারা গেছেন, তাদের লাশ উদ্ধার করে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব হতে পারে।’

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button