তৃণমূলে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে আরও ৫টি ইনমাস স্থাপন করছে সরকার
অক্টোবর, ২০২৬ (বাসস) : ক্যানসারসহ বিভিন্ন জটিল রোগের উন্নত রোগনির্ণয় ও চিকিৎসাসেবা দেশের তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছে দিতে বিভিন্ন অঞ্চলের মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোতে আরও পাঁচটি ইনস্টিটিউট অব নিউক্লিয়ার মেডিসিন অ্যান্ড অ্যালায়েড সায়েন্সেস (ইনমাস) স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
নতুন ইনমাস স্থাপন করা হবে সুনামগঞ্জ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, নোয়াখালী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, পটুয়াখালী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল এবং কিশোরগঞ্জের শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন (বিএইসি) ২০৩০ সালের জুনের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে।
উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) অনুযায়ী, চার বছর মেয়াদি এ প্রকল্পে আনুমানিক ৫৩৫ কোটি ৫৪ লাখ টাকা ব্যয় হবে। সম্পূর্ণ ব্যয় সরকারি তহবিল থেকে নির্বাহ করা হবে।
পরিকল্পনা কমিশনের একজন কর্মকর্তা জানান, প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বিবেচনাধীন রয়েছে।
বাসসের সঙ্গে আলাপকালে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত বলেন, বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবা বিকেন্দ্রীকরণ ও দেশের সর্বত্র মানুষের জন্য ক্যানসার-সংশ্লিষ্ট চিকিৎসাসেবা সহজলভ্য করার বৃহত্তর সরকারি উদ্যোগের অংশ হিসেবে প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা ক্যানসার আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়তে দেখছি। এ রোগে অনেক মানুষ মারা যাচ্ছেন। তাই ক্যানসার প্রতিরোধ ও চিকিৎসায় সরকার বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করছে।’
প্রতিমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে অধিকাংশ ক্যানসার রোগীকে বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা নিতে ঢাকায় যেতে হয়।
ড. এম এ মুহিত আরও বলেন, ‘তাই আমরা এসব সেবা বিকেন্দ্রীকরণ করতে চাই, যাতে মানুষ অন্তত নিজ নিজ বিভাগে ক্যানসারের চিকিৎসা নিতে পারেন।’
প্রকল্পের নথিতে বলা হয়েছে, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল প্রাঙ্গণে বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা সম্প্রসারণের মাধ্যমে রাজধানীকেন্দ্রিক স্বাস্থ্যসেবার ওপর মানুষের নির্ভরতা কমানো এ উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য।
একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মানের আধুনিক নিউক্লিয়ার মেডিসিন সেবা ও তৃণমূল পর্যায়ে মানুষের জন্য সাশ্রয়ী চিকিৎসাসুবিধা নিশ্চিত করাও প্রকল্পটির উদ্দেশ্য।
নতুন ইনমাসগুলোতে থাইরয়েড, কিডনি, যকৃৎ ও হৃদযন্ত্রসহ বিভিন্ন অঙ্গের রোগ এবং নানা ধরনের ক্যানসারের জন্য নিউক্লিয়ার মেডিসিনভিত্তিক সেবা দেওয়া হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এসব প্রতিষ্ঠান চিকিৎসাবিষয়ক গবেষণা ও বিশেষায়িত মানবসম্পদ গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও ভূমিকা রাখবে।
দেশজুড়ে নিউক্লিয়ার মেডিসিন সেবা সম্প্রসারণ
প্রকল্পটি এমন এক সময়ে নেওয়া হয়েছে, যখন বাংলাদেশ বিদ্যমান নেটওয়ার্কের বাইরে নিউক্লিয়ার মেডিসিন সেবা আরও বিস্তৃত করার উদ্যোগ নিয়েছে।
প্রকল্পের নথি অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ৩৭টি মেডিকেল কলেজ রয়েছে। এর মধ্যে বিএইসি ইতোমধ্যেই ২২টি সরকারি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল প্রাঙ্গণে ইনমাস স্থাপন করেছে। অবশিষ্ট মেডিকেল কলেজগুলোতেও পর্যায়ক্রমে এ সেবা সম্প্রসারণের প্রয়োজন রয়েছে বলে উল্লেখ করেছে।
নথিতে বলা হয়েছে, ঢাকা, মিটফোর্ড, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, রাজশাহী, রংপুর, দিনাজপুর, খুলনা, ফরিদপুর, বগুড়া, সিলেট, কুমিল্লা ও বরিশালসহ ১৩টি সরকারি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল প্রাঙ্গণে ইনমাস স্থাপন করা হয়েছে।
এ ছাড়া শহীদ সোহরাওয়ার্দী, পাবনা, কুষ্টিয়া, যশোর, সাতক্ষীরা, গোপালগঞ্জ ও কক্সবাজার মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল প্রাঙ্গণে আরও সাতটি ইনমাস রয়েছে। মহাখালী টিবি হাসপাতাল প্রাঙ্গণেও একটি ইনমাস স্থাপন করা হয়েছে।
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়েও রয়েছে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউক্লিয়ার মেডিসিন অ্যান্ড অ্যালায়েড সায়েন্সেস (নিনমাস)।
প্রকল্পের নথি অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে জায়গা পাওয়ার পর নতুন পাঁচটি ইনমাসের স্থান নির্বাচন করা হয়েছে। স্থান নির্ধারণের ক্ষেত্রে ভৌগোলিক অবস্থান, জনসংখ্যা ও স্বাস্থ্যসেবার চাহিদা বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
আধুনিক রোগনির্ণয় প্রযুক্তি ও যন্ত্রপাতি
নতুন ইনমাসগুলোতে আধুনিক নিউক্লিয়ার মেডিসিন ও রোগনির্ণয় প্রযুক্তি স্থাপন করা হবে। এর মধ্যে রয়েছে পজিট্রন এমিশন টমোগ্রাফি-কম্পিউটেড টমোগ্রাফি (পিইটি-সিটি), সিঙ্গেল ফোটন এমিশন কম্পিউটেড টমোগ্রাফি-কম্পিউটেড টমোগ্রাফি (স্পেক্ট-সিটি), স্পেক্ট, বোন মিনারেল ডেনসিটি (বিএমডি), ফোর-ডি আলট্রাসাউন্ড, কালার ডপলার ও থাইরয়েড স্ক্যানার।
প্রকল্পের আওতায় পাঁচটি ইনস্টিটিউটের ভবন নির্মাণ, দেশীয় ও আমদানি করা যন্ত্রপাতি সংগ্রহ, মানবসম্পদ উন্নয়ন ও প্রশিক্ষণ, জনবল নিয়োগ, আসবাবপত্র কেনা এবং যানবাহন সংগ্রহ করা হবে।
মোট প্রকল্প ব্যয়ের মধ্যে প্রায় ৪৯৮ কোটি ৮ লাখ টাকা, অর্থাৎ ৯৩ শতাংশ, মূলধনী ব্যয় হিসেবে বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। রাজস্ব ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১৭ কোটি ৫৪ লাখ টাকা।
প্রকল্প প্রস্তাবে বৈদেশিক মুদ্রায় ব্যয়ের পরিমাণ ধরা হয়েছে ১৭৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা। এর বড় অংশ ব্যয় হবে আমদানি করা যন্ত্রপাতি ও সংশ্লিষ্ট সরঞ্জাম সংগ্রহে।
সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ও প্রকল্প প্রস্তাব সংশোধন
প্রকল্পের নথি অনুযায়ী, পার্টিসিপেটরি অ্যাকশন রিসার্চ অব হিউম্যান অ্যাডভান্সমেন্ট (পারা) সম্ভাব্যতা সমীক্ষা পরিচালনা করেছে। সমীক্ষার সুপারিশের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রকল্পটি প্রণয়ন করা হয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশনের প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটি (পিইসি) ২০২৬ সালের ১০ মে প্রকল্প প্রস্তাবটি পর্যালোচনা করে বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ পূরণের শর্তে সুপারিশ করে। পরে ডিপিপি সংশোধন করে পুনরায় কমিশনে জমা দেওয়া হয়।
পিইসি লাইসেন্স ও বিমা ব্যয়ের বিস্তারিত যৌক্তিকতা, আমদানি করা এবং স্থানীয়ভাবে সংগৃহীত যন্ত্রপাতির সুনির্দিষ্ট বিবরণ ও পরিমাণ, সরকারি ক্রয়বিধি অনুসরণের বিষয়টি এবং প্রকল্পের মেয়াদ শেষে প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম কীভাবে পরিচালিত হবে— সে বিষয়ে সুস্পষ্ট পরিকল্পনা চেয়েছিল।
কমিটি প্রকল্প অনুমোদনের এক মাসের মধ্যে অভিজ্ঞ একজন পূর্ণকালীন প্রকল্প পরিচালক নিয়োগেরও সুপারিশ করে।
সংশোধিত প্রকল্প প্রস্তাবে বিস্তারিত বাস্তবায়ন সময়সূচি এবং প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও অবকাঠামো ও সেবাগুলো সচল রাখার বিধান অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশন মোট ৫৩৫ কোটি ৫৪ লাখ ৪৮ হাজার টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে প্রকল্পটি বিবেচনা ও অনুমোদনের জন্য একনেকে উপস্থাপনের সুপারিশ করেছে।




