শীর্ষ নিউজসংগঠন সংবাদ
রক্তাক্ত মানচিত্র ও বারুদের গন্ধে ঈদ: এক উন্মত্ত পৃথিবীর আত্মহনন গাথা
অসীম বিকাশ বড়ুয়া
২০২৬ সালের এই দগ্ধ বসন্তে যখন আকাশের কোণে শাওয়ালের বাঁকা চাঁদ উদিত হওয়ার অপেক্ষায়, তখন তা কেবল উৎসবের বার্তা নয়, বরং আমাদের বিবেকের কাছে এক পৈশাচিক আর্তনাদ হয়ে ফিরছে। রমজানের দীর্ঘ আত্মশুদ্ধি শেষে যে শান্তির ললিত বাণী পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ার কথা ছিল, আজ তা ঢাকা পড়ে গেছে ইরান, ইসরায়েল আর আমেরিকার ক্ষেপণাস্ত্রের আস্ফালনে। পৃথিবীর আকাশ আজ নক্ষত্রের আলোয় নয়, বরং দূরপাল্লার মিসাইল আর ড্রোনের নীল আলোয় কলঙ্কিত। মানবতার এই চরম দুর্দিনে দাঁড়িয়ে জীবনানন্দ দাশের সেই হাহাকার আজ ধ্রুব সত্য— “অদ্ভুত আঁধার এক এসেছে এ পৃথিবীতে আজ, যারা অন্ধ সবচেয়ে বেশি আজ চোখে দেখে তারা।”
বর্তমান বিশ্ব এক বিচিত্র বৈপরীত্যের কসাইখানা। যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জয়গান গাওয়ার কথা ছিল, সেখানে আজ আদিম হিংস্রতায় ভূখণ্ড দখলের মত্ততা। দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, যা বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত ট্রাভেল হাব, আজ ইরানের ড্রোন ও মিসাইল হামলায় রণক্ষেত্র। শত শত ফ্লাইট বাতিল, হাজার হাজার যাত্রী আটকা পড়ে আছেন অনিশ্চয়তায়। দুবাইয়ের আকাশে আজ বিলাসবহুল বিমানের বদলে চক্কর দিচ্ছে যুদ্ধবিমান। আবুধাবির জায়েদ বিমানবন্দরেও ঝরছে রক্ত। কেবল দুবাই নয়, দোহার রাস লাফান ইন্ডাস্ট্রিয়াল সিটিতে ইরানের ভয়াবহ হামলায় কেঁপে উঠেছে বিশ্ব জ্বালানি বাজার। ২০ শতাংশ বিশ্ব এলএনজি সরবরাহকারী এই শিল্পাঞ্চল এখন আগুনের কুণ্ডলী। শান্তি এখন কেবল অভিধানের ধুলোপড়া শব্দ।
গাজার দীর্ঘশ্বাস আজ ইতিহাসকে লজ্জিত করে। গত দুই বছরের যুদ্ধে নিহতের সংখ্যা ৭৫,০০০ ছাড়িয়েছে, যার মধ্যে ৬৬,০০০-ই নারী ও শিশু। ল্যানসেট-এর প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, পরোক্ষ মৃত্যুসহ এই সংখ্যা প্রায় ১ লক্ষ ৮৬ হাজারে গিয়ে ঠেকতে পারে। অন্যদিকে ইউক্রেন সীমান্তে প্রায় ১৭ লক্ষ মানুষের হতাহতের ক্ষত এখনো টাটকা। সুদান ও কঙ্গোর গৃহযুদ্ধে বাস্তুচ্যুত ২ কোটি মানুষ আজ পৃথিবীর বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ৫৯টি সক্রিয় সংঘাত নিয়ে পৃথিবী আজ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সবচেয়ে বড় মানবিক সংকটে।
গৌতম বুদ্ধ বলেছিলেন— “শান্তি নিজের ভেতর থেকে আসে, এটি বাইরে খুঁজো না।” আজ বিশ্ব মোড়লেরা নিজের ভেতর নয়, অন্যের মানচিত্র জয় করতে ব্যাকুল। সৌদি আরব স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দিচ্ছে— তারা যে কোনো সময় ইরানের ওপর পাল্টা হামলা চালাবে এবং তারা আর ‘যুদ্ধ বন্ধের’ অনুরোধ করবে না। ডোনাল্ড ট্রাম্পের হুঙ্কার— হরমোজ প্রণালী তাদের দখলে আসতে খুব কম সময় লাগবে।
অথচ ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, শক্তির দম্ভে কোনো সাম্রাজ্যই শেষ রক্ষা পায়নি। ১৯৪৫ সালে হিরোশিমায় যে ২ লক্ষ ১৪ হাজার মানুষ মুহূর্তেই ছাই হয়েছিল, তার তেজস্ক্রিয়তা আজও জাপানের শিশুদের পঙ্গু করে রাখছে। বর্তমানে বিশ্বে ১২,২৪১টি পারমাণবিক অস্ত্র মজুত আছে। বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন ঠিকই বলেছিলেন— “আমি জানি না তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ কী দিয়ে লড়া হবে, তবে চতুর্থ বিশ্বযুদ্ধ লড়া হবে পাথর আর লাঠি দিয়ে।”
ঈদের মৌলিক শিক্ষা হলো ‘ক্ষমা’ ও ‘সহমর্মিতা’। অথচ আজ রাষ্ট্রনায়কদের অহমিকার কাছে জিম্মি ৮০০ কোটি মানুষ। মহাত্মা গান্ধী বলেছিলেন— “ক্ষমা হলো বলবানের ভূষণ।” রাষ্ট্রনায়করা যদি এই দর্শনে বিশ্বাসী হতেন, তবে গাজার শিশুদের রক্তে আজ ঈদের জামা রাঙাতে হতো না। কাতার থেকে কুয়েত—সর্বত্রই আজ বারুদের গন্ধ।
বাংলার বিদ্রোহী কবি নজরুল ইসলাম গেয়েছিলেন
“আজ ভুলে যা তোর দোস্ত-দুশমন, হাত মেলাও হাতে,
তোর প্রেম দিয়ে কর বিশ্ব নিখিল ইসলামে মুরিদ।” এই ‘প্রেম’ আজ তেলের ব্যারেল আর ডলারের কাছে অর্থহীন। কিন্তু সাধারণ মানুষ হিসেবে আমাদের কি কিছুই করার নেই? আমাদের উচিত এই যুদ্ধের বিরুদ্ধে, এই মারণাস্ত্রের বিরুদ্ধে ঘৃণা জানানো। কারণ, যুদ্ধ যখন শুরু হয়, তখন সত্য ও মানবতা প্রথম নিহত হয়।
বারুদের গন্ধে আমোদিত এই অস্থির পৃথিবীতে ঈদুল ফিতর আসুক নিরাময় হয়ে। ঈদের আনন্দ কেবল নতুন পোশাকে নয়, বরং ছড়িয়ে পড়ুক শরণার্থী শিবিরের মলিন মুখে। বিশ্বনেতারা যদি পারমাণবিক বোমার চেয়ে মানবিক সংহতিকে বেশি গুরুত্ব দেন, তবেই প্রতিটি শিশুর জন্য এই পৃথিবী হবে নিরাপদ। অন্ধকার যতই ঘন হোক, আকাশের বাঁকা চাঁদ আমাদের আশার আলো দেখায়। সেই আলোর মিছিলে শামিল হয়ে আসুন আমরা শপথ নেই—ঘৃণা নয়, ভালোবাসা দিয়েই জয় করবো আগামীর পৃথিবী।
অন্ধকার কাটুক, মানবতার জয় হোক।ঈদ মোবারক।
লেখক: সাংবাদিক,এক্স সহ-সভাপতি(কোরিয়া-বাংলা প্রেসক্লাব)




