চট্টগ্রামে ‘লালদিঘির ডাক্তার’: প্রেশার ২০, ডায়াবেটিস ৫০ টাকা
সেপ্টেম্বর, ২০২৬ (বাসস) : ভোরের আলো ফোটার পর কিংবা বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামতেই বদলে যায় চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক লালদিঘির চারপাশের দৃশ্যপট। কেউ দ্রুত পায়ে হাঁটছেন, কেউ দৌড়াচ্ছেন, কেউ আবার দল বেঁধে করছেন শরীরচর্চা। বয়সে তরুণ থেকে শুরু করে ষাটোর্ধ্ব মানুষ— সবারই দেখা মেলে এই হাঁটার পথে।
বিশেষ করে বয়স্কদের অনেকেই নিয়মিত আসেন স্বাস্থ্য ঠিক রাখতে। হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত হয়ে কেউ বসেন ওয়াকওয়ের পাশের সিটে, একটু জিরিয়ে নেন। এরই মধ্যে কেউ শরীরের কোনো ধরনের অস্বস্তি বোধ করলে ‘চিন্তা নেই’। খুব দূরে যেতে হয় না, হাতের নাগালেই মেলে প্রেশার ও ডায়াবেটিস চেক করার সুযোগ।
শরীরচর্চা করতে আসা মানুষের তাৎক্ষণিক চিকিৎসা সেবায় প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যায় লালদিঘির ওয়াকওয়ের পাশের সিটে এসে বসেন কয়েকজন ল্যাব টেকনিশিয়ান, এলএমএএফ চিকিৎসক। সঙ্গে থাকে স্টেথোস্কোপ, প্রেশার মাপার মেশিন ও ডায়াবেটিস পরীক্ষার সরঞ্জাম।
হাঁটতে আসা বয়স্ক ও শরীরচর্চাকারীদেরকে তারা ডেকে বলেন, ‘প্রেশারটা মেপে দেখবেন?’
কেউ আগ্রহী হয়ে বসে পড়েন। কেউ নিজের শরীরের অবস্থা জানতে ডায়াবেটিসও পরীক্ষা করিয়ে নেন। প্রেশার মাপতে নেওয়া হয় ২০ টাকা আর ডায়াবেটিস পরীক্ষা করতে লাগে ৫০ টাকা। এই চিকিৎসকরা সেখানে এখন ‘লালদিঘির ডাক্তার’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।
স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীরা বাসসকে জানান, লালদিঘির ওয়াকওয়ে এখন শুধু হাঁটা বা শরীরচর্চার জায়গা নয়, অনেকের কাছে এটি হয়ে উঠেছে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার স্থানও।
তারা আরও জানান, ভোর থেকে সকাল ১০টা পর্যন্ত ও বিকাল ৪টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত এমন দৃশ্য এখন পরিচিত। বিশেষ করে বয়স্কদের একটি বড় অংশ নিয়মিত এখানে হাঁটতে আসেন। হাঁটা বা ব্যায়ামের সময় কোনো অস্বস্তি লাগলে তারা সেখানকার স্বাস্থ্যসেবাদাতাদের কাছে গিয়ে পরীক্ষা করিয়ে নেন।
গত বুধবার সকাল ৮টায় লালদিঘিতে হাঁটতে আসা ষাটোর্ধ্ব আবদুল জব্বারের সঙ্গে কথা হয়।
বেসরকারি ব্যাংকের চাকরি থেকে সদ্য অবসর নেওয়া জব্বার বাসসকে বলেন, ‘বয়স হয়েছে, সুস্থ থাকার জন্য এখানে নিয়মিত সকালে হাঁটতে আসি। তবে প্রেশার নিয়ে একটু চিন্তা থাকে। এখানে ইচ্ছে হলে প্রেশারটা চেক করে দেখতে পারি, সুবিধাটা ভালোই লাগে।’
ব্যায়াম করতে আসা আরেকজন বলেন, ‘ব্যায়ামের পর কখনো কখনো শরীর দুর্বল লাগে, বিশ্রাম নেওয়ার ফাঁকে এখানে বসেই প্রেশারটা মেপে দেখি। যেহেতু হাতের কাছে সুবিধা আছে, তাই অবহেলা করি না।’
শুধু হাঁটতে আসা বা শরীরচর্চা করতে আসা লোকজনই নয়, আশপাশের অনেক মানুষ শুধুই প্রেশার কিংবা ডায়াবেটিস পরীক্ষা করাতেই এখানে আসেন। এমনই একজন কে সি দে রোডের মোহন দে।
তিনি বলেন, হাসপাতাল বা ডায়াগনস্টিক সেন্টারে যাওয়ার জন্য আলাদা সময় বের করতে হয়। এখানে পরীক্ষা করা যায় জানার পর থেকে এখানেই পরীক্ষা করে নিই।
লালদিঘিতে নিয়মিত চিকিৎসা সহায়তা বা প্রেশার-ডায়াবেটিস পরীক্ষা করা অরবিন্দ বড়ুয়া বাসসকে বলেন, ‘লালদিঘিতে নিয়মিত শরীরচর্চা করতে আসা মানুষের মধ্যে বয়স্কদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। তাদের অনেকের বিভিন্ন ঝুঁকি আছে, কিন্তু নিয়মিত পরীক্ষা করান না। আমরা এখানে বসে তাদেরকে সেই পরীক্ষা করার সুযোগ দিই।’
তিনি আরও বলেন, ‘প্রতিদিন অন্তত ১০/১৫ জন প্রেশার ডায়াবেটিস পরীক্ষা করান। এতে কয়েক ঘণ্টায় ৪০০-৫০০ টাকা আয় হয়।’
বিষয়টি সম্পর্কে দৃষ্টি আকর্ষণ করে মতামত জানতে চাইলে চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক, বিশিষ্ট কার্ডিওলজিস্ট ডা. মো. একরাম হোসেন বাসসকে বলেন, ‘শরীরচর্চার পাশাপাশি নিজের তাৎক্ষণিক শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে সচেতন থাকাও জরুরি। কারণ, ব্যায়ামের সময় শরীরের প্রেশার বেড়ে যায় কিংবা ডায়াবেটিসের মধ্যে একটা তারতম্য ঘটতে পারে। বিশেষ করে বয়স্কদের ক্ষেত্রে নিয়মিত প্রেশার ও রক্তে শর্করার মাত্রা সম্পর্কে ধারণা থাকা দরকার।’
তিনি আরও বলেন, লালদিঘির মতো জনসমাগমের জায়গায় সহজে পরীক্ষা করার সুযোগ তৈরি হওয়া ইতিবাচক। এতে কিছু মানুষের আয়ও হচ্ছে। তবে এ ক্ষেত্রে খুব সতর্ক থাকতে হবে, যাতে সঠিকভাবে প্রেশার ও সুগারের মাত্রা পরিমাপ করা হয় এবং প্রেসার ও সুগারের মাত্রা পরিমাপ করার সরঞ্জামগুলো যেন মানসম্মত হয়।




