বিশেষ খবর

বাজার মূলধন বাড়াতে আইপিও ছাড়াই তালিকাভুক্তির সুযোগ, বিধিমালা চূড়ান্ত হচ্ছে আজ

 

অক্টোবর, ২০২৬ (বাসস) : শেয়ারবাজারের বাজার মূলধন বাড়ানো এবং বড় কর্পোরেট ও বহুজাতিক কোম্পানিকে পুঁজিবাজারে যুক্ত করার লক্ষ্যে প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) ছাড়াই সরাসরি তালিকাভুক্তির বিধিমালা চূড়ান্ত করেছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। আজ মঙ্গলবার কমিশন সভায় অনুমোদনের পর বিধিমালাটি গেজেট আকারে প্রকাশের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো হবে।

বিএসইসি চেয়ারম্যান মাসুদ খান বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা-বাসসকে এ তথ্য জানিয়েছেন।

সম্প্রতি ঢাকায় বিশ্ব বিনিয়োগকারী সপ্তাহ-২০২৬ উপলক্ষে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) ও ডিএসই ব্রোকারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিবিএ) যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত ‘ডিজিটাল ডিসেপশন অ্যান্ড স্ক্যাম অ্যালার্ট’ শীর্ষক সেমিনার শেষে তিনি বাসসকে বলেন, সরাসরি তালিকাভুক্তির বিধিমালা চূড়ান্ত করা হয়েছে। কমিশন সভায় অনুমোদন সম্পন্ন হলে এটি গেজেট আকারে প্রকাশের জন্য পাঠানো হবে।

নতুন এই ব্যবস্থার মাধ্যমে যোগ্য সরকারি, বেসরকারি ও বহুজাতিক কোম্পানির বিদ্যমান শেয়ারহোল্ডাররা তাদের শেয়ার বিক্রি করে সরাসরি শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার সুযোগ পাবেন। এতে বড় ও প্রতিষ্ঠিত কোম্পানিগুলোকে পুঁজিবাজারের আওতায় আনার পাশাপাশি বাজারের পরিধি ও মূলধন বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।

গত ৫ অক্টোবর অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে সরাসরি তালিকাভুক্তির ওপর দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে। এর ফলে সরকারি, বেসরকারি ও বহুজাতিক কোম্পানির সরাসরি তালিকাভুক্তির পথ খুলে যায়। এর আগে ‘বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (ডাইরেক্ট লিস্টিং অব সিকিউরিটিজ অন দ্য স্টক এক্সচেঞ্জ) রুলস, ২০২৬’-এর খসড়া গত ১ সেপ্টেম্বর জনমতের জন্য প্রকাশ করা হয়েছিল।

প্রস্তাবিত বিধিমালার আওতায় কোম্পানিগুলো নতুন শেয়ার ইস্যু করে অর্থ সংগ্রহ করবে না। বরং উদ্যোক্তা, পরিচালক ও প্রাথমিক শেয়ারহোল্ডাররা তাদের বিদ্যমান শেয়ারের একটি অংশ বিক্রি করবেন। ফলে শেয়ার বিক্রির অর্থ কোম্পানির পরিবর্তে সংশ্লিষ্ট শেয়ারহোল্ডাররা পাবেন। এ ব্যবস্থায় নতুন শেয়ার ইস্যু ছাড়াই বড় কোম্পানিগুলোকে বাজারে যুক্ত করা সম্ভব হবে।

বড় কোম্পানির জন্য সুযোগ

প্রস্তাবিত বিধিমালা অনুযায়ী, বার্ষিক লেনদেন বা মোট সম্পদের পরিমাণ এক হাজার কোটি টাকার বেশি—এমন কোম্পানিকে সরাসরি তালিকাভুক্তির সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে। এছাড়া পরিশোধিত মূলধনের অন্তত ৫১ শতাংশ সরকারের মালিকানাধীন অথবা কোনো কোম্পানিতে সরকারের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ অংশীদারত্ব কমপক্ষে ১০ শতাংশ হলে সেটিও যোগ্য হতে পারে। বিদেশি শেয়ারহোল্ডারদের মালিকানা অন্তত ৫১ শতাংশ—এমন কোম্পানিও এ সুযোগ পেতে পারে।

বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) লাইসেন্সপ্রাপ্ত টেলিযোগাযোগ, তথ্যপ্রযুক্তি সেবা, অবকাঠামো ও উৎপাদন খাতের প্রতিষ্ঠানের পরিশোধিত মূলধন কমপক্ষে ৩০০ কোটি টাকা হতে হবে। অন্তত তিন বছর ধরে কার্যক্রম পরিচালনাকারী তফসিলি ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বিমা কোম্পানিও নির্ধারিত শর্ত পূরণ সাপেক্ষে এ সুযোগ পেতে পারে। এছাড়া কমপক্ষে এক হাজার কোটি টাকা বার্ষিক লেনদেন বা মোট সম্পদ রয়েছে—এমন কোম্পানি এবং স্টক এক্সচেঞ্জ, ডিপোজিটরি ও নিবন্ধিত ক্লিয়ারিং ও সেটেলমেন্ট কোম্পানিকেও এ ব্যবস্থার আওতায় আনার প্রস্তাব রয়েছে।

যোগ্যতা ও শেয়ার বিক্রির শর্ত

সরাসরি তালিকাভুক্তির জন্য কোম্পানিকে অন্তত তিন বছর বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। আগের দুই অর্থবছরে মূল ব্যবসা থেকে মুনাফা অর্জন, সঞ্চিত লোকসান না থাকা এবং সর্বশেষ অর্থবছরে পরিচালন কার্যক্রম থেকে ইতিবাচক নগদ প্রবাহ থাকার শর্ত রাখা হয়েছে। তবে স্টক এক্সচেঞ্জের সুপারিশের ভিত্তিতে কমিশন মুনাফার শর্ত শিথিল করতে পারবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ঋণতথ্যে কোম্পানি, উদ্যোক্তা বা পরিচালকের ঋণখেলাপি হওয়ার তথ্য থাকলে সরাসরি তালিকাভুক্তির সুযোগ থাকবে না। বিনিয়োগযোগ্য মানের নিচে ঋণমানসম্পন্ন কোম্পানি এবং ঋণসিকিউরিটির দায় পরিশোধে খেলাপি কোম্পানিও এ সুবিধা পাবে না। কোম্পানির আর্থিক বিবরণী আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিবেদন মান (আইএফআরএস) অনুযায়ী প্রস্তুত এবং আন্তর্জাতিক নিরীক্ষা মান (আইএসএ) অনুসারে নিরীক্ষিত হতে হবে।

তালিকাভুক্তির পর উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের সম্মিলিত মালিকানা কমপক্ষে ৩০ শতাংশ রাখতে হবে। প্রথম ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে সরকারি মালিকানাধীন, সরকারি অংশীদারত্ব রয়েছে এমন এবং বিদেশি মালিকানাধীন কোম্পানিকে অন্তত ১০ শতাংশ শেয়ার বিক্রি করতে হবে। অন্য যোগ্য কোম্পানির ক্ষেত্রে এ হার হবে অন্তত ২০ শতাংশ। বিশেষ পরিস্থিতিতে কমিশন এ শর্ত শিথিল করতে পারবে।

প্রথম দিনের লেনদেনে বিশেষ ব্যবস্থা

সরাসরি তালিকাভুক্ত কোম্পানির শেয়ারের প্রথম দিনের লেনদেনে মূল্য নির্ধারণের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। প্রথম ৩০ মিনিট শুধু ক্রয়াদেশ দেওয়া যাবে। প্রথম দিন বিক্রির জন্য নির্ধারিত শেয়ারের অন্তত ৫০ শতাংশ বিক্রি করতে হবে। অবশিষ্ট শেয়ার পরবর্তী ২৯ কার্যদিবসের মধ্যে বিক্রি করতে হবে। শেয়ারের ফ্লোর প্রাইস নির্ধারিত হবে রেফারেন্স মূল্যের চেয়ে কমপক্ষে ২০ শতাংশ নিচে।

প্রথম দুই কার্যদিবসে সাধারণ ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা সংশ্লিষ্ট কোম্পানির শেয়ার বিক্রি করতে পারবেন না। তৃতীয় কার্যদিবসে লেনদেন বন্ধ রেখে শেয়ার বিতরণ ও নিষ্পত্তির কাজ সম্পন্ন করা হবে। চতুর্থ কার্যদিবস থেকে স্বাভাবিক লেনদেন শুরু হবে।

প্রথম পাঁচ কার্যদিবসে একক ক্রয় বা বিক্রয় আদেশে সর্বোচ্চ এক হাজার শেয়ার দেওয়া যাবে। তালিকাভুক্তির পর এক বছর উদ্যোক্তা ও পরিচালকরা সংশ্লিষ্ট কোম্পানির শেয়ার কিনতে পারবেন না। এ ছাড়া তালিকাভুক্তির সময় শেয়ার বিক্রির প্রস্তাবদাতাদের হাতে থাকা শেয়ারের ৫০ শতাংশের বেশি বিক্রির ওপর নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত সীমাবদ্ধতা থাকবে।

আবেদন ও তথ্য প্রকাশের নিয়ম

সরাসরি তালিকাভুক্তির জন্য সংশ্লিষ্ট স্টক এক্সচেঞ্জে আবেদন করতে হবে। এজন্য এক লাখ টাকা ফি দিতে হবে। স্টক এক্সচেঞ্জ কোম্পানির আর্থিক, আইনগত, কারিগরি ও পরিবেশগত বিষয় যাচাই করে অনুমোদনের সিদ্ধান্ত নেবে। আবেদন প্রত্যাখ্যাত হলে কোম্পানি ৩০ দিনের মধ্যে বিএসইসির কাছে আপিল করতে পারবে।

শেয়ারের মূল্য নির্ধারণে অন্তত দুটি পদ্ধতি ব্যবহার করতে হবে—অ্যাবসোলিউট ও রিলেটিভ ভ্যালুয়েশন। অনুমোদনের পর তিন কার্যদিবসের মধ্যে কোম্পানিকে তথ্যপত্র প্রকাশ করতে হবে। পাশাপাশি দুটি বাংলা ও দুটি ইংরেজি জাতীয় দৈনিকে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করতে হবে।

তথ্যপত্রে কোম্পানির আর্থিক অবস্থা, ব্যবসা, ঝুঁকি, শেয়ার মালিকানা, ঋণ, মামলা, কর্পোরেট সুশাসন ও শেয়ারের মূল্যায়নসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রকাশ করতে হবে। শেয়ার বিক্রির অর্থ কোম্পানি নয়, সংশ্লিষ্ট শেয়ারহোল্ডাররা পাবেন—এ বিষয়টিও স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে।

বিধিমালাটি কার্যকর হলে নির্ধারিত যোগ্যতা পূরণকারী বড় কোম্পানিগুলোর জন্য পুঁজিবাজারে প্রবেশের একটি বিকল্প পথ তৈরি হবে। একই সঙ্গে বিনিয়োগকারীদের জন্য নতুন কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগের সুযোগ বাড়বে। তবে এ ব্যবস্থার সুফল নির্ভর করবে যোগ্যতা যাচাই, স্বচ্ছ মূল্যায়ন, পর্যাপ্ত তথ্য প্রকাশ এবং বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সুরক্ষায় বিধিমালার কার্যকর প্রয়োগের ওপর।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button