
আল হেলাল,সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি : ভাটির জনপদ সুনামগঞ্জ জেলাবাসীকে ধৈর্য্যরে সাথে দুর্যোগ মোকাবেলার আহবাণ জানিয়েছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু। তিনি বলেছেন, হাওরাঞ্চলে কৃষকদের সুরক্ষায় সরকার বন্যাশ্রয় কেন্দ্র ও বজ্রপাত নিরোধক টাওয়ার নির্মাণ করবে। বজ্রপাতের সময় কৃষকদের সতর্ক করতে এসব টাওয়ারে সিগন্যাল বা সাইরেনের ব্যবস্থা থাকবে। এখন থেকে বন্যা বা বজ্রপাতে গরু,মহিষ,হাঁস মোরগ ও ছাগল মারা গেলেও সরকার কৃষকদের আর্থিক সহায়তা প্রদান করবে।
মঙ্গলবার (৫ মে) সকাল সাড়ে ১১টায় সুনামগঞ্জ সার্কিট হাউস মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত এক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। অতিবৃষ্টি ও জলাবদ্ধতায় ক্ষতিগ্রস্থ কৃষকদের প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে তিন মাস মেয়াদী সহায়তা প্রদান কার্যক্রম উপলক্ষে জেলা পর্যায়ের কর্মকর্তা, রাজনীতিক ও গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে এই সভা অনুষ্ঠিত হয়। বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা (অর্থ ও পরিকল্পনা) রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।
বিভাগীয় কমিশনার আশরাফুর রহমানের সভাপতিত্বে ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) সমর কুমার পালের পরিচালনায় অনুষ্ঠানে সুনামগঞ্জ-৫ আসনের এমপি কলিম উদ্দিন আহমেদ মিলন, সুনামগঞ্জ ৪ আসনের সংসদ সদস্য এডভোকেট নুরুল ইসলাম নুরুল,সুনামগঞ্জ-৩ আসনের এমপি মোহাম্মদ কয়ছর এম আহমেদ এবং সুনামগঞ্জ-১ আসনের এমপি কামরুজ্জামান কামরুল,জেলা পরিষদের প্রশাসক মিজানুর রহমান চৌধুরী মিজান,বিএনপি নেতা মোঃ আকবর আলী ও এডভোকেট শেরেনুর আলীসহ জেলা বিএনপির নেতৃবৃন্দরা বক্তব্য রাখেন।
মন্ত্রী বলেন, “বজ্রপাতে প্রাণহানির ক্ষতি পূরণ করা সম্ভব নয়, তবে আমরা ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারকে দেওয়া আর্থিক সহায়তার পরিমাণ দ্বিগুণ করেছি। নীতিমালায় সংশোধন এনে এবার গবাদিপশুর মৃত্যুর বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।” সরকার কৃষকদের পাশে সবসময় আছে এবং থাকবে উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন,প্রধানমন্ত্রী হাওরের পরিস্থিতি নিয়ে শুরু থেকেই উদ্বিগ্ন এবং প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্থদের তালিকা তৈরিতে স্বচ্ছতা বজায় রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। হাওরে আর কোনো নামমাত্র বা ঠিকাদার-পোষা প্রকল্প হবে না, বরং হাওরকে নিরাপদ উৎপাদন ক্ষেত্র হিসেবে গড়ে তোলা হবে।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সহায়তা যেন প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্থদের হাতে পৌঁছায়, সেটি নিশ্চিত করতে হবে। ভবিষ্যতে দুর্যোগ মোকাবেলায় দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে সরকার। তিনি বলেন“প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিশ্বাস করেন এ দেশের কৃষকের অর্থনীতি শক্তিশালী হলেই বাংলাদেশের অর্থনীতি শক্তিশালী হবে। হাওরাঞ্চলে অতিবৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্থ কৃষকদের পাশে দাঁড়াতে সরকার বদ্ধপরিকর। জনপ্রতিনিধি ও সরকারি কর্মকর্তাদের প্রতি আমার অনুরোধ,প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্থ কৃষকরাই যেন সরকারি সহায়তা পায়।” নিজের কৃষক স্বত্তার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “আমি দেখে আসছি কৃষকরা ধান কাটছে। আপনারা আমাকে ক্ষেতে নামান, দেখবেন আমিও কারো থেকে কম নই। আমি অরিজিনাল জাত কৃষক।”
একই অনুষ্ঠানে দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণে অনিয়ম ও অপরিকল্পিত কাজের কঠোর সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, “কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্থ হবে সেটা মেনে নেওয়া যায়না। অভিযোগ উঠেছে পানি উন্নয়ন বোর্ড অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ করায় কৃষকদের সমস্যা হচ্ছে। শুধু ঠিকাদার পোষার জন্য বা টাকা নয়ছয় করতে যেন অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প গ্রহণ না করা হয়।” সুনামগঞ্জ এক ফসলি অঞ্চল হওয়ায় কৃষকদের সারা বছরের জীবিকা রক্ষায় টেকসই প্রকল্প তৈরির নির্দেশ দেন তিনি।
সভায় সুনামগঞ্জের সংসদ সদস্যরা কৃষকদের ক্ষয়ক্ষতির সঠিক চিত্র মন্ত্রীদের সামনে তুলে ধরেন। এ সময় কৃষি কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্যের সত্যতা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন সুনামগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট নুরুল ইসলাম নুরুল। তিনি অভিযোগ করেন, ৯১ হাজার হেক্টরের বেশি ফসলি জমি আজ সংকটে থাকলেও কৃষি কর্মকর্তারা ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে দেখানোর চেষ্টা করছেন। তিনি বলেন, “সুনামগঞ্জের হাওর শুধু জীবিকা নয়, এটি আমাদের প্রাণ। পাহাড়ি ঢল থেকে ফসল রক্ষায় পরিকল্পিত স্লুইচগেট, আধুনিক নিষ্কাশন ব্যবস্থা ও আগাম জাতের বীজের নিশ্চয়তা প্রয়োজন।” জেলা কৃষি কর্মকর্তার দেওয়া ‘৮০ ভাগ ধান কাটা হয়ে গেছে এমন তথ্যের বিরোধিতা করেন জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মিজান চৌধুরীসহ অন্যান্য স্থানীয় নেতারা। তাদের দাবি, এখনো জেলার ৫০ ভাগ ফসল পানির নিচে রয়েছে।
সভা শেষে দুই মন্ত্রী ৪০০ জন ক্ষতিগ্রস্থ কৃষকের মাঝে ২০ কেজি করে চাল ও নগদ অর্থ বিতরণ করেন। এর আগে প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী তিন মাস মেয়াদী মানবিক সহায়তা কার্যক্রম বাস্তবায়ন নিয়ে কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় দিক নির্দেশনা প্রদান করা হয়।




