আরব্য হলুদ ফল ‘সাম্মাম’ চীন থেকে চট্টগ্রামের বাজারে
সেপ্টেম্বর ২০২৬ (বাসস) : চট্টগ্রাম নগরীর আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদ মার্কেটের সামনে ফুটপাতে হঠাৎ চোখে পড়ল হলুদ রঙের নতুন ফল। দূর থেকে দেখলে দেশি বাঙ্গী কিংবা কোনো বিদেশি জাতের তরমুজ মনে হতে পারে। তবে কাছে গেলে চোখে পড়ে গায়ে লাগানো গোল স্টিকার। সেখানে ইংরেজিতে লেখা।‘সাম্মাম, হানি ডিউ, এক্সপোর্ট কোয়ালিটি।’
এই সময়ে বাজারে বিক্রি হওয়া বেশিরভাগ দেশি-বিদেশি ফলের ভিড়ে আকার-আকৃতি আর রঙে ভিন্ন ধরনের এই ফল দেখে চলতিপথে থমকে দাঁড়াচ্ছেন অনেকে। মসৃণ গায়ে হলুদ আবরণের এই ফলটির ওজন দুই থেকে তিন কেজির কাছাকাছি, অনেকটা দেশি বাঙ্গীর মতো হলেও ভেতরটা বেশ রসালো এবং স্বাদে সুমিষ্ট।
গত দুয়েক সপ্তাহ ধরে নগরীর আন্দরকিল্লা, মোমিন রোড, জামালখান, চকবাজার, বহদ্দারহাট, নিউ মার্কেট এলাকায় এই ফলটি ভ্যানে বিক্রি করতে দেখা যাচ্ছে। ফলটি কেজি পরিমাপে বিক্রি হচ্ছে। প্রতি কেজি কোথাও ১৫০ টাকা, কোথাও বিক্রি হচ্ছে ১০০ টাকায়।
চট্টগ্রামের ফলের পাইকারি আড়ত স্টেশন রোডের ফলমন্ডিতে গিয়ে খবর নিয়ে জানা গেল, সাম্মাম মূলত আরব দেশের ফল। আমিরাত, ওমান ও কাতারে বেশি হয়। গত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কিছু জেলায় সাম্মামের বাণিজ্যিক চাষ হচ্ছে, তবে ফলন যথেষ্ট নয়। ফলমন্ডির আমদানিকারকরা এবার ফলটি চীন থেকে আমদানি করেছেন। প্রথম দিকে খুব বেশি পরিমাণে আনা হয়নি, দুয়েকটি চালান তারা পরীক্ষামূলকভাবে নিয়ে এসেছেন, চাহিদা বাড়লে আমদানিও বাড়ানো হবে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর চট্টগ্রামের অতিরিক্ত পরিচালক মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ বাসসকে বলেন, সাম্মামকে নিয়ে প্রথম দেখায় যতটা রহস্য তৈরি হয়, কৃষিবিজ্ঞানের দিক থেকে ফলটি ততটা অচেনা নয়। এটি মেলনজাতীয় ফল, যার সঙ্গে ‘রক মেলন, মাস্কমেলন, সুইটমেলন এবং হানিডিউ’র ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে। আরব দেশগুলোতে ‘সাম্মাম’ নামে এটি পরিচিত, সেখানেই বেশি উৎপাদিত হয়। তবে বাংলাদেশেও গত কয়েক বছর ধরে এটির বাণিজ্যিক চাষ শুরু হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘ফলটির বৈশিষ্ট্যও মেলনজাতীয়। বিভিন্ন জাত ও উৎপাদন পদ্ধতি অনুযায়ী এর বাইরের রং, ভেতরের শাঁস, গন্ধ, মিষ্টতা ও আকারে পার্থক্য থাকে। বাংলাদেশের বিভিন্ন খামারে চাষ করা সাম্মামের একেকটির ওজন দুই থেকে তিন কেজি পর্যন্ত হওয়ার তথ্যও পাওয়া গেছে।’
ফলমন্ডির বিসমিল্লাহ ট্রেডিং-এর স্বত্ত্বাধিকারি আবদুল জব্বার বাসসকে বলেন, ‘চট্টগ্রামের বাজারে এবার যে সাম্মাম দেখা যাচ্ছে, তা চীন থেকে আমদানি করা। কয়েকটি চালানের মাধ্যমে এগুলো এসেছে। ফলমণ্ডিতে আসার পর পাইকারি পর্যায় থেকে তা নগরীর বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে।’
জানা গেছে, চীন মেলন উৎপাদনে বিশ্বের অন্যতম প্রধান দেশ। দেশটির প্রায় সব প্রদেশেই কোনো না কোনো ধরনের মেলন উৎপাদিত হয়। উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল বিশেষ করে হানিডিউ ও হামী মেলনের জন্য পরিচিত। চীনে মেলনের বহু জাত ও উৎপাদন অঞ্চল রয়েছে।
জামালখান মোড় এলাকায় ভ্যানের একজন বিক্রেতা বলেন, ‘বিদেশি ফল হিসেবে পরিচিত হলেও অন্যান্য অনেক আমদানি করা ফলের তুলনায় এর দাম ক্রেতাদের কাছে তুলনামূলকভাবে সহজলভ্য মনে হচ্ছে। তাই কৌতূহলী ক্রেতার পাশাপাশি নিয়মিত ফল কেনেন এমন অনেক মানুষও সাম্মাম কিনে স্বাদ দেখছেন।’
তিনি বলেন, ‘সাম্মামের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ সম্ভবত এর স্বাদ। বাইরে থেকে ফলটি দেখে যে স্বাদের ধারণা তৈরি হয়, কাটার পর অনেক ক্রেতাই সেটিকে দেশি বাঙ্গীর সঙ্গে তুলনা করছেন। মিষ্টি, রসালো এবং সুগন্ধযুক্ত হওয়ায় খাওয়ার পদ্ধতিও অনেকটা বাঙ্গীর মতো। ফল কেটে ভেতরের শাঁস ও বীজ আলাদা করে খাওয়া যায়।’
চট্টগ্রামের প্রখ্যাত পুষ্টিবিদ হাসিনা আকতার লিপি ফলটি সম্পর্কে বলেন, ‘সাম্মাম মেলনজাতীয় হওয়ায় এর পুষ্টিগুণ উল্লেখযোগ্য। মেলনজাতীয় ফলে পানির পরিমাণ সাধারণত অনেক বেশি। ক্যান্টালুপ বা মাস্কমেলনের প্রতি ১০০ গ্রামে প্রায় ৯০ গ্রাম পানি থাকার তথ্য পাওয়া যায়। এতে ভিটামিন ই, ভিটামিন এ-এর পূর্বধাপ বিটা-ক্যারোটিন, পটাশিয়াম, ফোলেট ও কিছু খাদ্যআঁশও থাকে।




