নজরুল ছিলেন গণমুখী সাংবাদিকতার পথিকৃৎ: আবদুল হাই শিকদার

২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ (বাসস): জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন গণমুখী সাংবাদিকতার পথিকৃৎ। সাংবাদিকতাকে তিনি কেবল সংবাদ প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে দেখেননি, বরং শোষণ-বঞ্চনা, অন্যায়, বৈষম্য ও ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলার শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহার করেছেন।
বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা-বাসসকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে বিশিষ্ট কবি, প্রাবন্ধিক, সাংবাদিক ও নজরুল গবেষক আবদুল হাই শিকদার এ কথা বলেন।
তিনি বলেন, নজরুলের সাংবাদিকতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল অসাম্প্রদায়িকতা, নারীমুক্তি, জনগণের অধিকার এবং স্বাধীনতার পক্ষে দৃঢ় অবস্থান। ‘নবযুগ’ ও ‘ধূমকেতু’ পত্রিকার মাধ্যমে তিনি তৎকালীন সাংবাদিকতার প্রচলিত ধারায় পরিবর্তন আনেন এবং শাসকের চোখে চোখ রেখে কথা বলার সাহস দেখান।
আবদুল হাই শিকদার বলেন, তাঁর ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ কবিতার কারণে কারাবরণ সাংবাদিকতা ও ঔপনিবেশিক বিরোধী রাজনৈতিক অবস্থানের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। কবিতাটি বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব মাইলফলক। দেবী দুর্গার আবাহনের মোড়কে তিনি রূপকভাবে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের কসাইখানার রূপ তুলে ধরে তীব্র চাবুক মেরেছিলেন। এতে ব্রিটিশ সরকার এতটাই আতঙ্কিত হয় যে কবিতাটি প্রকাশের পর ‘ধূমকেতু’ পত্রিকা বাজেয়াপ্ত করে নজরুলকে গ্রেপ্তার করে সশ্রম কারাদণ্ড দেয়। নজরুলের জেল খাটা এবং এই বিদ্রোহী অবস্থান আমাদের সংবাদপত্রের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়।
তিনি বলেন, ‘নজরুল এসে সাংবাদিকতার চালচিত্র বদলে দেন। কবিতা দিয়ে সম্পাদকীয় লেখা এবং শিরোনাম করার নতুন রীতি তিনি প্রবর্তন করেন।
আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নজরুলকে তুলে ধরা
আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নজরুলের সাহিত্যকে যথাযথভাবে তুলে ধরার ক্ষেত্রে যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে বলে মনে করেন আবদুল হাই শিকদার।
তিনি বলেন, নজরুল ইনস্টিটিউটে তার কাজ করার সময় চীনা, ফার্সি ও উর্দু ভাষায় নজরুলের সাহিত্যের কিছু অনুবাদের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবে তা প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত সামান্য। নজরুলের সাহিত্যকে বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায় অনুবাদ এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রচারের জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে আরও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। চীন সফরের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, সেখানে কর্মকর্তাদের নজরুল সৃষ্টির ইংরেজি অনুবাদ উপহার দেওয়ার পর তাঁরা বিস্ময় প্রকাশ করেন যে ১৯২২ সালে একজন কবি সরাসরি স্বাধীনতার কথা বলেছেন এবং শোষিত মানুষের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন!
ইরান, মধ্যপ্রাচ্য ও সৌদি আরবেও একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিশ্ব দরবারে নজরুলকে যথাযথভাবে তুলে ধরতে তাঁর সাহিত্যকর্মের গুণগত মানসম্পন্ন অনুবাদ ও বহুল প্রচারের উদ্যোগ নিতে হবে।
নজরুলের বহু সৃষ্টি এখনো আড়ালে
দীর্ঘদিনের নজরুল গবেষণার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে আবদুল হাই শিকদার বলেন, নজরুলের সাহিত্য ও দর্শনের অনেক গভীর দিক এখনো যথাযথভাবে পাঠ করা হয়নি। দীর্ঘদিন নজরুল চর্চা করেছেন মূলত অতি আবেগীয় ও অর্ধশিক্ষিত কিছু মানুষ। তারা নজরুলের বাহ্যিক উচ্ছ্বাস ও আজগুবি বিষয়াদিকে প্রাধান্য দেওয়ায় তাঁর মূল দর্শন ছাইচাপা পড়ে গিয়েছিল।
তার মতে, কবি আবদুল কাদিরের হাত ধরে শুরু হওয়া আধুনিক নজরুলচর্চার ধারা পরবর্তীকালে কবি আবদুল মান্নান সৈয়দ, মোহাম্মদ মাহফুজউল্লাহ ও শাহাবুদ্দীন আহমদের মতো গবেষকদের মাধ্যমে এগিয়ে গেছে। তবে এ ক্ষেত্রে এখনো অনেক কাজ বাকি।
নজরুলচর্চাকে আরও গতিশীল ও অর্থবহ করার জন্য তাঁর সামগ্রিক সাহিত্যকর্ম নিয়ে গভীর গবেষণা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
নজরুল ও জিয়াউর রহমানের মধ্যে ভাবগত যোগসূত্র
নজরুলের বিদ্রোহী চেতনা ও শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মুক্তিযুদ্ধ ও রাষ্ট্রগঠনের রাজনৈতিক ভূমিকার মধ্যে ভাবগত যোগসূত্র রয়েছে বলে মনে করেন আবদুল হাই শিকদার।
তিনি বলেন, জিয়াউর রহমানের মা কলকাতা বেতারের ‘এ’ গ্রেডের নজরুলসংগীত শিল্পী ছিলেন। জিয়াউর রহমান ছোটবেলা থেকেই নজরুলের চেতনায় অনুপ্রাণিত ছিলেন।
আবদুল হাই শিকদার বলেন, নজরুল তাঁর সাহিত্য ও সাংবাদিকতার মাধ্যমে পরাধীন জাতিকে স্বাধীনতার জন্য প্রস্তুত করেছিলেন। একইভাবে ১৯৭১ সালে জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণা মুক্তিযুদ্ধের সময় মানুষকে উদ্বুদ্ধ করেছিল। স্বাধীনতা ও জাতীয় মুক্তির আকাক্সক্ষার জায়গায় উভয়ের মধ্যে একটি ভাবগত সাদৃশ্য রয়েছে।
নজরুলকে রাষ্ট্রীয় সম্মান
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামকে রাষ্ট্রীয়ভাবে সম্মানিত করার ক্ষেত্রে জিয়াউর রহমানের বিভিন্ন উদ্যোগের কথাও উল্লেখ করেন আবদুল হাই শিকদার।
তিনি বলেন, কবিকে সর্বোচ্চ জাতীয় সম্মান জানাতে জিয়াউর রহমানের অবদান ছিল অনন্য। নজরুলকে সম্মানিত করার অভিপ্রায় থেকেই তিনি ‘একুশে পদক’-এর সূচনা করেন এবং নজরুল ইসলামকেই প্রথম এ পুরস্কারে ভূষিত করেন। এছাড়া তিনি নজরুলকে বাংলাদেশের প্রাতিষ্ঠানিক জাতীয় নাগরিকত্ব দেন, যা পূর্বে কেবল মুখে মুখে সীমাবদ্ধ ছিল। কবিকে আর্মি ক্রেস্ট দেওয়া হয় এবং তাঁর প্রয়াণে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করা হয়।
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জানাজা শেষে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম, সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমান, বিমানবাহিনী প্রধান ও নৌবাহিনী প্রধান এই চারজন কবির মরদেহ কাঁধে বহন করে কবরস্থানে নিয়ে যান। একজন কবির লাশ রাষ্ট্রপ্রধান ও তিন বাহিনীর প্রধানদের কাঁধে বহন করার ঘটনা বিশ্ব ইতিহাসে নজিরবিহীন।
তিনি আরো বলেন, কবির ইচ্ছা অনুযায়ী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে তাঁকে দাফন করা হয়। ভারতের চুরুলিয়ায় দাফন করার পক্ষে কিছু আপত্তি বা চাপ থাকলেও জিয়াউর রহমান সেই ঝুঁকি নিয়ে বাংলাদেশেই কবিকে স্থায়ীভাবে সমাহিত করেন। দাফনের সময় সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে ২১ বার তোপধ্বনি ও পূর্ণ রাষ্ট্রীয় গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়।
পরবর্তীকালে জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি হয়ে ‘নজরুল র্যালি’ প্রবর্তন করেন এবং নিজে পায়ে হেঁটে এতে অংশ নেন। এছাড়া দোয়েল চত্বর থেকে মহাখালী সড়কটির নামকরণ করেন ‘কাজী নজরুল ইসলাম অ্যাভিনিউ’ এবং তাঁর শাসনামলেই প্রথম ‘জাতীয় নজরুল সঙ্গীত সম্মেলন’ অনুষ্ঠিত হয়।
বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ ও নজরুলের চেতনা
নজরুলের অসাম্প্রদায়িকতা, সাম্য ও মানবমুক্তির চেতনার সঙ্গে জিয়াউর রহমানের ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ’-এর একটি ভাবগত সম্পর্ক রয়েছে বলে মনে করেন আবদুল হাই শিকদার।
তিনি বলেন, আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে বাঙালি জাতীয়তাবাদের স্লোগানে যুদ্ধ হলেও সেখানে সাঁওতাল, চাকমা, মারমা, হাজং, গারো এবং এমনকি বিহারীদের একটি অংশও যোগ দিয়েছিল। স্বাধীনতার পর ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীদের নিজস্ব সাংস্কৃতিক ও নৃতাত্ত্বিক পরিচয় রক্ষায় যে সংকট দেখা দেয়, জিয়াউর রহমান ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ’-এর মাধ্যমে সবার সমান স্বাধিকার নিশ্চিত করার চেষ্টা করেছিলেন। এই দূরদর্শিতার মূল উৎস ছিলেন নজরুল।
নতুন প্রজন্মের কাছে নজরুলকে পৌঁছে দিতে হবে
নতুন প্রজন্মের কাছে নজরুলকে আরও ব্যাপকভাবে পৌঁছে দিতে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব দেন আবদুল হাই শিকদার।
তিনি বলেন, প্রতিটি পরিবারে নজরুলের রচনাবলির অন্তত একটি সেট থাকা উচিত। সপ্তাহে অন্তত একদিন পরিবারে নজরুলের কোনো কবিতা বা নিবন্ধ পাঠের চর্চা চালু করা যেতে পারে।
তরুণদের নজরুলের শিক্ষা ও সমাজদর্শনের সঙ্গে যুক্ত করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, নজরুলের মানবতাবাদ, অসাম্প্রদায়িকতা, সাম্য ও স্বাধীনতার চেতনাকে শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে আরও নিবিড়ভাবে যুক্ত করা প্রয়োজন।
প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নজরুলচর্চা এগিয়ে নিতে দেশের প্রতিটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘নজরুল সেন্টার’ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দেন তিনি। এসব কেন্দ্রে ‘নজরুল চেয়ার’-এর অধীনে উচ্চতর গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনার কথাও বলেন। একইসঙ্গে প্রতিটি বিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয় ও গ্রন্থাগারে নজরুলের রচনাবলি পৌঁছে দেওয়া এবং নজরুল গবেষকদের যথাযথ মর্যাদা দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
আবদুল হাই শিকদার বলেন, নজরুলকে শুধু ‘বিদ্রোহী কবি’ হিসেবে সীমাবদ্ধ না রেখে তাঁর সাহিত্য, সাংবাদিকতা, মানবতাবাদ, অসাম্প্রদায়িকতা, সাম্য ও সমাজদর্শনের সামগ্রিকতার আলোকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে হবে। তাঁর সাহিত্য ও চিন্তার গভীর পাঠের মধ্য দিয়ে নজরুলচর্চাকে আরও গতিশীল ও অর্থবহ করা সম্ভব।




