শীর্ষ নিউজসংগঠন সংবাদ

৩৫ হাজার মুক্তায় দেবী দুর্গার অপরূপ সাজ, সাতক্ষীরার বুড়িয়ায় দর্শনার্থীদের ঢল

 

অক্টোবর, ২০২৬ (বাসস) : মাটির প্রতিমায় ৩৫ হাজার মুক্তার নান্দনিক কারুকাজ, সঙ্গে লেজার লাইট ও নানা রঙের আলোর ঝলকানিতে যেন শিল্পীর নিপুণ হাতে দেবী দুর্গার এক অপরূপ রূপ।
সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার বড়দল ইউনিয়নের বুড়িয়া সার্বজনীন দুর্গাপূজা মণ্ডপে এবার এমন ব্যতিক্রমী আয়োজন ঘিরে তৈরি হয়েছে ব্যাপক কৌতূহল।

প্রায় সাড়ে ৪ লাখ টাকা ব্যয়ে মুক্তারখচিত প্রতিমা দেখতে ইতোমধ্যেই দূরদূরান্ত থেকে দর্শনার্থীরা আসতে শুরু করেছেন। পূজার পাঁচদিন বিশেষ আলোকসজ্জায় প্রতিমার সৌন্দর্য তুলে ধরার প্রস্তুতিও চলছে।

মাটির প্রতিমার শরীরে প্রথমে দেওয়া হয়েছে রঙের প্রলেপ, এরপর সূক্ষ্ম কারুকাজে বসানো হয়েছে মুক্তা। ১৩টি প্রতিমার বিভিন্ন অংশে প্রায় ৩৫ হাজার মুক্তার ব্যবহার পুরো আয়োজনকে দিয়েছে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য। আলো পড়লে প্রতিমার গায়ে ফুটে ওঠে ঝিকিমিকি আভা। সাত দশকের ঐতিহ্যবাহী এই পূজামণ্ডপে নতুনত্বের এ আয়োজন ইতোমধ্যেই স্থানীয় বাসিন্দা ও দর্শনার্থীদের আকৃষ্ট করেছে।

প্রতিমাশিল্পী নিউটন রায় জানান, প্রায় দেড় মাস ধরে চারজন শিল্পী নিরলস পরিশ্রম করে প্রতিমাগুলো তৈরি করেছেন। মুক্তার সূক্ষ্ম কাজ করতে সময় ও শ্রম দুটোই বেশি লেগেছে। প্রতিবছর নতুন কিছু করার চেষ্টা থেকেই এবার ভারতীয় সিনেমায় দেখা কয়েকটি মূর্তির নকশা ও নিজেদের পরিকল্পনার সমন্বয়ে প্রতিমার নকশা তৈরি করা হয়েছে। প্রতিমা তৈরির কাজ শেষ হলেও এখন চলছে প্যান্ডেল সাজানোর কাজ।

বুড়িয়া পূজা উদযাপন কমিটির সদস্য ও স্কুলশিক্ষক উত্তম কুমার বলেন, ব্যতিক্রমী উদ্যোগের মাধ্যমে এবার দেশবাসীকে মুক্তাখচিত দুর্গা প্রতিমা উপহার দিতে চান তারা।

তিনি আরও বলেন, গত ৫ আগস্ট থেকে শিল্পীরা প্রতিমা তৈরির কাজ শুরু করেন। প্রায় ৩৫ হাজার মুক্তা দিয়ে প্রতিমা সাজাতে প্রায় চার লাখ টাকা ব্যয় হচ্ছে। নির্মাণসামগ্রীর দাম বেড়ে যাওয়ায় প্রতিমা তৈরির খরচও বেড়েছে।

উত্তম কুমার বলেন, সাতক্ষীরার শ্যামনগরের আড়পাঙ্গাসিয়া ও বড়কুপোট এলাকায় প্রতিবছর ব্যতিক্রমী প্রতিমা তৈরি করা হয়। সেই ধারাবাহিকতায় বুড়িয়াতেও নতুন কিছু করার পরিকল্পনা থেকে মুক্তা দিয়ে প্রতিমা সাজানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, পূজার পাঁচ দিন লেজার, মার্কারি ও হ্যালোজেন লাইটের মাধ্যমে প্রতিমার সৌন্দর্য তুলে ধরা হবে।

তিনি দেশবাসীকে বুড়িয়া পূজামণ্ডপে এসে এই অভিনব আয়োজন উপভোগ করার আহ্বান জানান।

আয়োজকদের ভাষ্য, প্রায় ৭০ বছর আগে নারায়ণ সরকার ও দীপঙ্কর সরকারসহ কয়েকজন ধান ব্যবসায়ী কপোতাক্ষ নদের তীরে বুড়িয়া ওয়ার্ল্ড ভিশন স্কুলের বারান্দায় মাটির দুর্গা প্রতিমা স্থাপন করে পূজা শুরু করেন।

বর্তমানে মন্দিরের নিজস্ব জমি নেই। স্থানীয়ভাবে চাঁদা সংগ্রহ করে পূজার আয়োজন করা হয়। এবার সরকারিভাবে ৬০০ কেজি চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

বুড়িয়া পূজা উদযাপন কমিটির সাবেক সভাপতি ও স্কুলশিক্ষক ভবেশ চন্দ্র মণ্ডল বলেন, পূজামণ্ডপটি সিসি ক্যামেরার আওতায় রাখা হয়েছে। পাশাপাশি সরকারি ও স্থানীয় উদ্যোগে স্বেচ্ছাসেবকের মাধ্যমে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

মন্দির পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক প্রবীর মণ্ডল জানান, প্রতিমা দেখতে দর্শনার্থীদের আগ্রহে তারা আনন্দিত। পূজার পাঁচ দিন সুশৃঙ্খল ও উৎসবমুখর পরিবেশ বজায় রাখতে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, পূজা উপলক্ষে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও ধর্মীয় যাত্রাপালারও আয়োজন করা হয়েছে।

আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবারের পূজামণ্ডপটি সব ধর্মের মানুষের মিলনমেলায় পরিণত হবে বলে আশা করছেন আয়োজকেরা।

স্থানীয় স্কুলছাত্রী বন্যা মণ্ডল জানান, মুক্তা দিয়ে এত সুন্দর প্রতিমা তৈরি করা যায়, তা আগে তার জানা ছিল না। বাড়ির পাশে তৈরি এই প্রতিমা দেখতে খুব ভালো লাগছে। সহপাঠীদের নিয়ে তিনি প্রতিমার সৌন্দর্য উপভোগ করেছেন।

বিজয়া দশমীর দিন মণ্ডপে বড় আকারে আড়ং বসবে জানিয়ে বন্যা আরও বলেন, এবার সেখানে অন্য বছরের তুলনায় বেশি আনন্দ হবে বলে তার প্রত্যাশা।

দর্শনার্থী অলকা রানী জানান, মুক্তা দিয়ে তৈরি এমন প্রতিমা এবারই প্রথম দেখেছেন তিনি। তিনি বলেন, ব্যতিক্রমী এই প্রতিমা দেখতে বিভিন্ন স্থান থেকে মানুষ আসছেন।

পূজার দিনগুলোতে যাতে কোনো বিশৃঙ্খলা না ঘটে, সে জন্য সবাইকে সচেতন থাকার আহ্বান জানান তিনি।

সাতক্ষীরার পুলিশ সুপার আবু সালেহ মো. আশরাফুল আলম জানান, জেলায় এবার ৬১০টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে। পূজা নির্বিঘ্ন করতে জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।

মুক্তার ঝলমলে কারুকাজ, বিশেষ আলোকসজ্জা ও সাত দশকের ঐতিহ্য-সব মিলিয়ে বুড়িয়া সার্বজনীন দুর্গাপূজা মণ্ডপ এবার দর্শনার্থীদের কাছে বিশেষ আকর্ষণ হয়ে উঠেছে।

আয়োজকদের প্রত্যাশা, এই আয়োজন ধর্মীয় উৎসবের আনন্দের পাশাপাশি সম্প্রীতি ও মিলনের বার্তাও ছড়িয়ে দেবে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button