চট্টগ্রামশীর্ষ নিউজ

চট্টগ্রামে আমন আবাদের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন : মাঠজুড়ে সবুজের বিস্তার

 

সেপ্টেম্বর, ২০২৬ (বাসস) : বন্যার ধকল, জমিতে পানি, নষ্ট হয়ে যাওয়া বীজতলা— সব আশঙ্কা পেছনে ফেলে চট্টগ্রামে আমন আবাদ প্রায় শেষ করে আনছেন কৃষকরা। ইতোমধ্যে চট্টগ্রাম অঞ্চলের সব জেলার কৃষিজমিতে লক্ষ্যমাত্রার প্রায় শতভাগ আমনের চারা রোপণ হয়েছে। ভাদ্রের হালকা বৃষ্টিতে রোপা চারা সজীবতার পেখম মেলছে। মাঠজুড়ে বিস্তার ঘটেছে সবুজের।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, চট্টগ্রামে এবার ১ লাখ ৭৯ হাজার ৯৮০ হেক্টর জমিতে আমন আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। এর বিপরীতে ইতোমধ্যে আবাদ হয়েছে ১ লাখ ৭৯ হাজার ৬৬০ হেক্টর, যা লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ১০০ শতাংশ। ফলে নির্ধারিত সময়ের আগেই লক্ষ্যমাত্রার কাছাকাছি পৌঁছে গেছে আমন আবাদ।

চট্টগ্রামের সবচেয়ে বড় কৃষিক্ষেত্র রাঙ্গুনিয়ার গুমাইবিলে ইতোমধ্যে আমনের চারা রোপা শেষ হয়েছে। সেখানে এখন ধীরে ধীরে আমনের গুচ্ছ পরিপক্ব হয়ে উঠছে, পুরো বিলজুড়ে বাতাসে দোল খেতে শুরু করেছে সবুজ পাতা। দক্ষিণ চট্টগ্রামের কর্ণফুলী, পটিয়া, আনোয়ারা, বাঁশখালী, চন্দনাইশ, সাতকানিয়া এবং লোহাগাড়া উপজেলার বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠ সবুজে ছেয়ে গেছে। গত কয়েকদিন আগে সরেজমিনে পটিয়ায় দেখা গেছে, সেখানকার কৃষকরা এখন ধান রোপার পর জমিতে প্রথম দফার সার প্রয়োগ করছেন, কোথাও কোথাও আগাছা পরিষ্কারও চলছে।

পটিয়ার হাইলধর এলাকার কৃষক সৈয়দ নূর বলেন, ‘আমি প্রতি বছর ৫ কানি (দুই একর) জমিতে ধান চাষ করি, এবারও তা-ই করেছি। এবার বর্ষটা খুব ভালো যাচ্ছে, ফুল বর্ষা (কোনো বছর অনাবৃষ্টি বা অতিবৃষ্টি না হলে চাষের সুবিধা বুঝাতে স্থানীয় ভাষায় এই শব্দটি ব্যবহৃত হয়) পানির সংকট হচ্ছে না, জমি একবার শুকাতে না শুকাতে আবারও বৃষ্টি হচ্ছে। আবহাওয়া ভালো থাকায়, আমন রোপা হাইল ধরেছে (পরিপক্ব হওয়া)। এবার ফলন ভালো হবে বলে আশা করছি।’

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, চট্টগ্রাম অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক কৃষিবিদ মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ বাসসকে বলেন, ‘অনুকূল আবহাওয়া, সময় মতো চারা রোপণ, প্রয়োজনীয় সার ও বীজের সরবরাহ এবং বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সরকারি সহায়তার কারণে এবার আমন আবাদ দ্রুত এগিয়েছে। বন্যার পরও চারা নিয়ে কৃষকদের বড় ধরনের সংকটে পড়তে হয়নি। সরকারি পক্ষ থেকে দ্রুত পুনর্বাসন সহায়তা দেওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা সময় মতো মাঠে ফিরতে পেরেছেন।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, চট্টগ্রাম আঞ্চলিক কার্যালয়ের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কক্সবাজারেও আমন আবাদ লক্ষ্যমাত্রার খুব কাছাকাছি পৌঁছেছে। জেলায় মোট ১৮ হাজার ৮৮৫ হেক্টর জমিতে আমন আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। এর মধ্যে হাইব্রিড, উফশী ও স্থানীয় জাত মিলিয়ে ১৮ হাজার ৪২২ হেক্টর জমিতে ইতোমধ্যে আমন চারা রোপা হয়েছে, আবাদের অগ্রগতি ৯৯ শতাংশ।

নোয়াখালীতে আমন আবাদের চিত্র আরও এগিয়ে। জেলার এবার আমন আবাদ লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। ফেনীতে এবার আমন আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল প্রায় ৬৬ হাজার ৮৯৪ হেক্টর। ইতোমধ্যে আবাদ হয়েছে প্রায় ৬৬ হাজার ৮৩৭ হেক্টর জমিতে। পাঁচ জেলার মধ্যে লক্ষ্মীপুরে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় আবাদ সবচেয়ে বেশি এগিয়েছে। জেলার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে অগ্রগতি হয়েছে ১১৭ শতাংশ। অর্থাৎ নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি জমিতে আমন আবাদ হয়েছে।

কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, আমনের ভালো দাম পাওয়ার প্রত্যাশা, অনুকূল আবহাওয়া এবং কৃষকদের আগ্রহের কারণে অনেক জমিতে পরিকল্পনার বাইরে গিয়েও আমন আবাদ হয়েছে।

কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, আমন মৌসুমে চারা সংকট তৈরি হলে আবাদ পিছিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। কিন্তু এবার সরকারি উদ্যোগে চারা উৎপাদন ও বিতরণ এবং স্থানীয়ভাবে কৃষকদের প্রস্তুত করা বীজতলার কারণে বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়নি। চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলায় কৃষকেরা নিজেদের বীজতলা থেকে চারা সংগ্রহের পাশাপাশি স্থানীয় নার্সারি ও কৃষি বিভাগের সহায়তাও পেয়েছেন। ফলে জমি প্রস্তুত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই চারা রোপণ করা সম্ভব হয়েছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, চট্টগ্রাম জেলার উপ-পরিচালক কৃষিবিদ আপ্রু মারমা বাসসকে বলেন, ‘এবার আমন মৌসুমের শুরুতে বন্যার কারণে কিছুটা শঙ্কা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু পানি নেমে যাওয়ার পর কৃষকরা দ্রুত জমি প্রস্তুত করেছেন। প্রয়োজনীয় সার-বীজ ও চারা সরবরাহ নিশ্চিত থাকায় রোপণ কাজে বড় ধরনের ছন্দপতন হয়নি। আবহাওয়াও এখন পর্যন্ত আমনের জন্য সহায়ক থাকায় লক্ষ্যমাত্রা অর্জন দ্রুত সম্ভব হয়েছে।’

সাতকানিয়ার একজন উপ সহকারী কৃষি কর্মকর্তা বলেন, ‘এবার সবচেয়ে ইতিবাচক বিষয় হচ্ছে কৃষকদের মধ্যে আমন আবাদ নিয়ে আগ্রহ কমেনি। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সরকারি সহায়তা দেওয়া হয়েছে, অনেক জায়গায় চারা ও বীজ সরবরাহ করা হয়েছে। ফলে চারা সংকট তৈরি হয়নি। মাঠপর্যায়ে কৃষকদের নিয়মিত পরামর্শ দেওয়ার পাশাপাশি সারসহ প্রয়োজনীয় উপকরণ নিশ্চিত থাকায় নির্ধারিত সময়ের আগেই আবাদ লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছেছে।’

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button